kalerkantho

কমিউনিস্ট কলোনি পেরিয়ে কিরগিজস্তান

আতাউর রহমান খসরু   

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কমিউনিস্ট কলোনি পেরিয়ে কিরগিজস্তান

পাহাড়বেষ্টিত অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত এক টুকরা কিরগিজস্তান

মধ্য এশিয়ার সবুজ-শ্যামল ও পাহাড়বেষ্টিত অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত মুসলিম দেশ কিরগিজস্তান। স্থলবেষ্টিত পাথুরে দেশটিতে কোনো সমুদ্রের দেখা না পেলেও নীরবে বয়ে যায় অসংখ্য পাহাড়ি নদী ও ঝরনাধারা। দেশটির বুক চিরে বয়ে গেছে দুই হাজার ৪৪টি ছোট-বড় নদী, যা থেকে উৎপাদিত হয় প্রচুর পরিমাণ জলবিদ্যুৎ। এ ছাড়া দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস, দস্তা, ইউরেনিয়াম ও সোনার মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও দেশটির অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর। কিরগিজস্তানের ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষি কাজ ও পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করে।

এক লাখ ৯৯ হাজার ৯৫১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কিরগিজস্তানের জনসংখ্যা মাত্র ৬২ লাখ এক হাজার ৯১২।  জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ২৭ জন। মোট জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশ মুসলিম এবং তাদের বেশির ভাগ সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী। এ ছাড়া অর্থডক্স খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্মাবলম্বী রয়েছে দেশটিতে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মতো এখানে রয়েছে জাতিগত ভিন্নতা। কিরগিজ, উজবেক, রুশ, উইঘুর, দাগান প্রভৃতি নৃতাত্ত্বিক জাতি কিরগিজস্তানে বসবাস করে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগেই কিরগিজস্তানে ইসলামের আগমন হয়। আরব ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা ঐতিহাসিক সিল্ক রোড ধরে ওই অঞ্চলে যাতায়াত করত, তাদের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের মানুষ ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হয়। ৮৩ হিজরিতে মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম ফারগানা জয় করলে এই অঞ্চলে ইসলামী শাসনের সূচনা হয়। প্রাচীনকালে কিরগিজস্তান ফারগানারই অংশ ছিল। তবে প্রাচীন কিরগিজস্তানে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে ইরানের সেলজুক শাসকদের মাধ্যমে। সেলজুক প্রধানমন্ত্রী নেজামুল মুলক তুসি এই অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেলজুকদের পরবর্তী সময়ে মঙ্গলীয় শাসকরা ইসলাম গ্রহণ করে। এই অঞ্চল তাদের শাসনাধীন হওয়ার পর তারাও ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে।

কিরগিজস্তানে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ

১৮৬৬ সালে রুশ সাম্রাজ্য কিরগিজস্তান দখল করলে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। ১৯৩৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিরগিজস্তানকে একটি স্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা প্রদান করে। ৩১ আগস্ট ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

রুশ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনামলে দেশটিতে ইসলামচর্চা বিশেষভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। রুশ সাম্রাজ্য কিরগিজস্তান দখলের সময় আরবি ছিল দেশটির দ্বিতীয় প্রধান ভাষা। কিন্তু রুশ শাসকরা আরবিচর্চা নিষিদ্ধ করে এবং রুশ ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্বাধীনতার তিন দশক পরও দেশটির রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমাজব্যবস্থায় রুশ শাসনের প্রভাব বিদ্যমান। বর্তমানে কিরগিজস্তানের দ্বিতীয় প্রধান ভাষা রুশ এবং প্রধান ভাষা ‘কিরগিজ’ও লেখা হয় রুশ বর্ণে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় কিরগিজস্তানে মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৯।

তবে আশার কথা হলো, স্বাধীনতা লাভের পর কিরগিজস্তানে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় অনুরাগ বাড়ছে এবং সেখানে ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটছে। বর্তমানে দেশটিতে আড়াই হাজারের মতো মসজিদ, ৮১টি ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৬৮টি সরকার অনুমোদিত সংস্থা ও সংগঠন রয়েছে। সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। কিরগিজ মুসলিমরা এখন আগ্রহের সঙ্গে মসজিদে আসে, তাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোতে পাঠায়। এভাবে ক্রমেই কিরগিজস্তানে ইসলাম বিকশিত হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য