kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

কোরআনে বর্ণিত আজাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছয় জাতি

মুফতি কাসেম শরীফ

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



কোরআনে বর্ণিত আজাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছয় জাতি

মুসা (আ.)-এর কূপ, মিসরের কায়রো থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত

মুসা (আ.)-এর জাতি

ফেরাউনের মৃত্যু গোটা বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সেনাবাহিনী, পারিষদবর্গ ও প্রাসাদের জৌলুস ফেরাউনকে উদ্ধত করেছিল। নিজের ক্ষমতার ব্যাপ্তি দেখে নিজেই বিস্মৃত হয়েছিল ফেরাউন। তাই সে নিজেকে খোদা দাবি করেছিল। মুসা ও হারুন (আ.) তার কাছে ঈমানের দাওয়াত নিয়ে যান। কিন্তু ফেরাউনের উন্মত্ততা আরো বেড়ে যায়। সে আল্লাহর নবী মুসা (আ.)-কে হত্যা করতে মনস্থির করে। সদলবলে মুসা (আ.)-কে ধাওয়া করে। আল্লাহর হুকুমে সাগরে পথ সৃষ্টি হয়। মুসা (আ.) পার হয়ে যান। কিন্তু ফেরাউন সাগরে ডুবে মারা যায়। আল্লাহর আজাব দেখে ফেরাউন তাওবা করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু তার তাওবা গৃহীত হয়নি, বরং তাকে পৃথিবীবাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমার (ফেরাউন) দেহ রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে উদাসীন।’ (সুরা : ইউনুুস, আয়াত : ৯২)

এ বিষয়ে আসমানি ধর্মগ্রন্থ বিশেষজ্ঞ ড. মরিস বুকাইলি লিখেছেন, সব সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে লোরেট ১৮৯৮ সালে রাজাদের উপত্যকায় (কিংস ভ্যালি) থিবিসে দ্বিতীয় রামাসিসের পুত্র ও মহাযাত্রাকালীন ফেরাউনের (মিনফাতাহ) মমি করা লাশ আবিষ্কার করেন। সেখান থেকে তা কায়রোতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯০৭ সালের ৮ জুলাই এলিয়ট স্মিথ এ মমির আবরণ অপসারণ করেন। তিনি তাঁর ‘দ্য রয়াল মমিজ’ নামক গ্রন্থে (১৯১২) এর প্রক্রিয়া ও লাশ পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। কয়েকটি জায়গায় কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও মমিটি তখন সন্তোষজনকভাবেই সংরক্ষিত ছিল। তখন থেকেই তার মাথা ও গলা খোলা। অবশিষ্ট দেহ কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় দর্শকদের দেখার জন্য কায়রো জাদুঘরে রাখা আছে। সম্ভবত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় লাশের ঢাকনা আর খুলতে দেওয়া হয় না। ১৯১২ সালে এলিয়ট স্মিথের তোলা ছবি ছাড়া পুরো লাশের আর কোনো ছবিও জাদুঘরে নেই।

ঐতিহাসিক চিহ্ন-দ্রব্য সংরক্ষণ করা মানুষের স্বাভাবিক কর্তব্য। কিন্তু এ মমির ক্ষেত্রে সেই কর্তব্য অনেক বেশি বড় ও ব্যাপক হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এ মমি হচ্ছে এমন একজনের লাশের বাস্তব উপস্থিতি, যে মুসা (আ.)-কে চিনত। তার পরও সে তাঁর হেদায়েত প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাঁর পলায়নকালে তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করেছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে। আর কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তার লাশ পরবর্তী সময় মানুষের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। আল্লাহর হুকুমে তা ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছিল। (সূত্র : কোরআন, বাইবেল ও বিজ্ঞান)

সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম সাগরতীরে যেখানে ফেরাউনের লাশ সাগরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, আজও জায়গায়টি অপরিবর্তিত আছে। বর্তমানে এ জায়গার নাম জাবালে ফেরাউন বা ফেরাউন পর্বত। এরই কাছাকাছি আছে একটি গরম পানির ঝরনা। স্থানীয় লোকেরা এর নাম দিয়েছে হাম্মামে ফেরাউন। এর অবস্থানস্থল হচ্ছে আবু জানিমের কয়েক মাইল ওপরে—উত্তরের দিকে। স্থানীয় লোকেরা জায়গাটি চিহ্নিত করে বলে, ফেরাউনের লাশ এখানে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

 

মাদিয়ান শহরের ধ্বংসাবশেষ

শোয়াইব (আ.)-এর জাতি

অর্থনৈতিক অনাচারে বিধ্বস্ত মাদিয়ান শহর

আল্লাহর আজাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ছয়টি প্রাচীন জাতির মধ্যে অন্যতম জাতি হলো ‘আহলে মাদিয়ান’।

তাদের সম্পর্কে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মাদিয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শোয়াইবকে আমি পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর ওজন ও পরিমাপে কম দিয়ো না। আমি তো দেখছি তোমরা সমৃদ্ধিশালী (এর পরও তোমরা ওজনে কম দিলে), আমি তোমাদের জন্য এক সর্বগ্রাসী দিনের আজাবের আশঙ্কা করছি।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৪)

‘মাদিয়ান’ লুত সাগরের সন্নিকটে সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। এটি এখনো পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর মোআনের অদূরে বিদ্যমান।

কুফরি করা ছাড়াও এ জনপদের লোকেরা ওজন ও মাপে কম দিত। অন্যের সম্পদ লুটপাট করত। অন্যায় পথে জনগণের সম্পদ ভক্ষণ করত। এই শহরের গোড়াপত্তন করেছিলেন মাদিয়ান ইবনে ইবরাহিম (আ.)। তিনি মুসা (আ.)-এর শ্বশুর ছিলেন। লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসের অনতিকাল পরে মাদিয়ানবাসীদের প্রতি তিনি প্রেরিত হয়েছেন। চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ‘খতিবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের মধ্যে সেরা বাগ্মী নামে খ্যাত ছিলেন। মাদিয়ানবাসীকে পবিত্র কোরআনে কোথাও কোথাও ‘আসহাবুল আইকা’ বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো জঙ্গলের বাসিন্দা। এটি বলার কারণ হলো, এই অবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। মহান আল্লাহ সেখানেই তাদের ধ্বংস করে দেন। কেউ কেউ বলেন, ওই জঙ্গলে ‘আইকা’ নামের একটি গাছকে তারা পূজা করত। এ কারণে তাদের ‘আসহাবুল আইকা’ বলা হয়।

শোয়াইব (আ.) অর্থনৈতিক সততার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এর আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহর ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা বা দোয়া-দরুদই বোঝায় না, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আল্লাহর বিধান মেনে চলাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য নবী-রাসুলের উম্মতের ওপর আজাব এসেছে আল্লাহকে অস্বীকার ও আল্লাহর নবীদের অবাধ্য হওয়ার কারণে। কিন্তু শোয়াইব (আ.)-এর জাতির ওপর আজাব এসেছে বিশেষভাবে অর্থনৈতিক অসততার কারণে। তাই অর্থনৈতিক অসততা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।

 

আদ জাতির অট্টালিকার ধ্বংসস্তূপ

হুদ (আ.)-এর জাতি

নিমিষেই বিনাশ আদ জাতির অট্টালিকা

আদ জাতির সুউচ্চ প্রাসাদ ও টাওয়ার ছিল। কিন্তু সেগুলোও তাদের প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখোনি, তোমার প্রতিপালক আদ জাতির ইরাম গোত্রের প্রতি কী (আচরণ) করেছেন—যারা ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের অধিকারী, যার সমতুল্য (প্রাসাদ) কোনো দেশে নির্মিত হয়নি।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ৬-৮)

শক্তি ও ক্ষমতার বাহাদুরি তাদের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। অনায়াসেই তারা বলে বেড়াত, ‘(এ দুনিয়ায়) আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কে আছে?’ কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তারাও উপলব্ধি করতে পারে যে আল্লাহর হুকুমের সামনে, প্রকৃতির প্রতিশোধের কাছে মানুষ বড় অসহায়। আত্ম-অহমিকা আদ জাতিকে পরকালের ব্যাপারে উদাসীন করে তোলে।

আদ জাতির অমার্জনীয় হঠকারিতার ফলে প্রাথমিক আজাব হিসেবে উপর্যুপরি তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগবাগিচা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি। তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয়। একপর্যায়ে গায়েবি আওয়াজ আসে যে তোমরা কোন ধরনের মেঘ পছন্দ করো? লোকেরা কালো মেঘ কামনা করে। তখন কালো মেঘ নেমে আসে। আদ জাতি তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, ‘এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে।’ জবাবে তাদের নবী হুদ (আ.) বলেন, ‘বরং এটি সেই বস্তু, যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটি এমন বায়ু, যার মধ্যে রয়েছে মর্মন্তুদ আজাব।’ পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত আজাব নেমে আসে। সাত রাত ও আট দিন ধরে অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রপাতে বাড়িঘর ধসে যায়। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে গাছপালা উপড়ে যায়। মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিত হয়ে সজোরে জমিনে পতিত হয়। (দেখুন—সুরা : হাক্কা, আয়াত : ৬-৮)

 

ঐতিহাসিক মৃত সাগরের এক পার্শ্ব

লুত (আ.)-এর জাতি

সাগর মরে গেছে পাপের ভারে

বিকৃত পাপে অভ্যস্ত ছিল লুত (আ.)-এর জাতি। লুত (আ.)-এর জাতি যে অঞ্চলে বাস করত, তাকে বর্তমানে ট্রান্স জর্দান বলা হয়। এটি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। বাইবেলে এ জাতির কেন্দ্রীয় স্থান ‘সাদুম’ বলা হয়েছে। সাদুম নগরী সবুজ শ্যামল ছিল। এতে পানির সরবরাহ ছিল পর্যাপ্ত। ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর ও শস্যে ভরপুর। অঞ্চলটিকে আল্লাহ তাআলা নানা প্রাচুর্য দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। লুত (আ.)-এর জাতি প্রাচুর্যময় জীবনযাত্রার সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে পরিচিত ও অপরিচিত এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সে জাতির ভেতর ছিল না। সে সময় তারা আরো একটি অপরাধ আবিষ্কার করেছিল, যা তখন পর্যন্ত অন্য কোনো জাতির মধ্যে দেখা যায়নি। সেটি হলো সমকামিতা। এই জঘন্য অপকর্ম তারা প্রকাশ্যে করে আনন্দ লাভ করত।

লুত (আ.)-এর জাতির পাপীদের ওপর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাপ্রলয় নেমে আসে। এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে। পাশাপাশি আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ওই মহাপ্রলয়ের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। ওই জনপদের ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান।

লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসস্থলটি বর্তমানে ‘বাহরে মাইয়েত’ বা ‘বাহরে লুত’ নামে খ্যাত। এটি ডেড সি বা মৃত সাগর নামেও পরিচিত। ফিলিস্তিন ও জর্দান নদীর মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল অঞ্চলজুড়ে নদীর রূপ ধারণ করে আছে এটি। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ নিচু। এর পানিতে তেলজাতীয় পদার্থ বেশি। এতে কোনো মাছ, ব্যাঙ, এমনকি কোনো জলজ প্রাণীও বেঁচে থাকতে পারে না। এ কারণেই একে ‘মৃত সাগর’ বলা হয়।

সাদুম উপসাগরবেষ্টিত এলাকায় এক ধরনের অপরিচিত উদ্ভিদের বীজ পাওয়া যায়, সেগুলো মাটির স্তরে স্তরে সমাধিস্থ হয়ে আছে। সেখানে শ্যামল উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার ফল কাটলে তার মধ্যে পাওয়া যায় ধুলাবালি ও ছাই।

এখানকার মাটিতে প্রচুর গন্ধক পাওয়া যায়। এই গন্ধক উল্কাপতনের অকাট্য প্রমাণ। ১৯৬৫ সালে ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানকারী একটি আমেরিকান দল ডেড সির পার্শ্ববর্তী এলাকায় এক বিরাট কবরস্থান দেখতে পায়, যার মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি কবর আছে। এটি থেকে অনুমান করা হয়, কাছেই কোনো বড় শহর ছিল। কিন্তু আশপাশে এমন কোনো শহরের ধ্বংসাবশেষ নেই, যার সন্নিকটে এত বড় কবরস্থান হতে পারে। তাই সন্দেহ প্রবল হয়, এটি যে শহরের কবরস্থান ছিল, তা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে।

সাগরের দক্ষিণে যে অঞ্চল রয়েছে, তার চারদিকেও ধ্বংসলীলা দেখা যায়। জমিনের মধ্যে গন্ধক, আলকাতরা, প্রাকৃতিক গ্যাস এত বেশি মজুদ দেখা যায় যে এটি দেখলে মনে হয়, কোনো এক সময় বিদ্যুৎ পতনে বা ভূমিকম্পে গলিত পদার্থ বিস্ফোরণে এখানে এক ‘জাহান্নাম’ তৈরি হয়েছিল। (সিরাতে সরওয়ারে আলম, দ্বিতীয় খণ্ড)

 

সামুদ জাতির পাথরখচিত অট্টালিকার স্মৃতিচিহ্ন

সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায়

পাথরঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে সামুদ জাতি

সামুদ জাতি শিল্প ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আদ জাতির পর আল্লাহ তাআলা তাদের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি দান করেছেন। কিন্তু তাদের জীবনযাপনের মান যতটা উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, মানবতা ও নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিল। একদিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে পাথর খোদাই করে করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে সমাজে কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটছিল। ন্যায়-ইনসাফ বলে সে সমাজে কিছুই ছিল না। অন্যায় ও অবিচারে সমাজ জর্জরিত হতে থাকে। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত সালেহ (আ.) যে সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন, তাতে নিম্ন শ্রেণির লোকেরাই সাড়া দেয়।

হিজর ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল। এর ধ্বংসাবশেষ মদিনার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমান শহর আল উলা থেকে কয়েক মাইল ব্যবধানে তা দেখা যায়।

সালেহ (আ.) সারা জীবন তাদের হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে অল্প কিছু সঙ্গী ছাড়া গোটা জাতি তাঁর অবাধ্যই থেকে যায়। একপর্যায়ে তারা দাবি করে, আপনি যদি সত্যি নবী হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে দেখান। এটি দেখাতে পারলে আমরা আপনার ওপর ঈমান আনব। সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর কুদরতে পাহাড় থেকে একটি অদ্ভুত রকমের মাদি উট বের হয়। তা দেখে কিছু লোক ঈমান আনে। কিন্তু তাদের সর্দাররা ঈমান আনেনি, বরং তারা সে উটনিকে হত্যা করে ফেলে। এতে সালেহ (আ.) তাঁর জাতির ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসার ঘোষণা দেন। তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে তিন দিন পরই আল্লাহর আজাব তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।

নির্ধারিত সময়ে আসমানি আজাব এসে অবিশ্বাসীদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারপর সীমা লঙ্ঘনকারীদের মহানাদ আঘাত করে। ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে (ধ্বংস হয়ে যায়)। যেন তারা কখনোই সেখানে বসবাস করেনি। জেনে রেখো, সামুদ জাতি তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। আরো জেনে রেখো, ধ্বংসই হলো সামুদ জাতির পরিণাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬৭-৬৮)

গগনবিদারী আওয়াজ সামুদ জাতির কর্ণকুহরে আঘাত হানে। সেই আওয়াজে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। একসময় যে জাতি পাহাড়ে ঘর নির্মাণ করত, পৃথিবীতে যাদের চেয়ে শক্তিশালী কোনো জাতি ছিল না, আসমানি আজাবে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। উদ্ধত সামুদ জাতির প্রতি হজরত সালেহ (আ.)-এর হুঁশিয়ারি সত্যি বাস্তবায়িত হয়েছে। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড শব্দে ভূমিকম্প তাদের নাস্তানাবুদ করে ফেলে। বজ্রপাতের ভয়ংকর শব্দে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত হয়ে যায়। অবশেষে তাদের অপমৃত্যু ঘটে।

 

ঐতিহাসিক আরারাত পাহাড়। এই পাহাড়ে নুহ (আ.)-এর নৌকা নোঙর গেড়েছিল বলে ধারণা করা হয়

নুহ (আ.)-এর জাতি

প্লাবনের দাগ লেগেছিল পৃথিবীজুড়ে

নুহ (আ.)-এর জাতি মূর্তিপূজা করত। আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-কে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করতে বলেছেন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়ার পরও তারা ঈমান আনেনি। তিনি তাঁর জাতিকে সত্যের পথে আনতে দীর্ঘ ৯৫০ বছর নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা নুহ (আ.)-এর দাওয়াত তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাঁকে বলেছিল, ‘হে নুহ! যদি তুমি বিরত না হও, তবে পাথর মেরে তোমার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ১১৬)

বহু চেষ্টায় অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর পথে এসেছিল। তাঁর সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। নুহ (আ.) তাদের আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেন। তবু তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। অবশেষে আল্লাহর আজাব আসে। এক ভয়ংকর প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস তাঁর জাতির অবাধ্য লোকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমন প্লাবন সেই জাতিকে গ্রাস করেছিল, যেই প্লাবন হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে আছে। তখন নুহ (আ.)-এর নৌকায় যারা আশ্রয় নিয়েছিল তারাই রক্ষা পেয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তার (নুহের) বংশধরদের অবশিষ্ট রেখেছি বংশপরম্পরায়।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ৭৭)

সাম তিন ছেলের মধ্যে বড় ছিলেন। তিনি ছিলেন আরব জাতির পিতা। তাঁর বংশধরদের মধ্যেই ছিলেন ইবরাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.)। ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর ছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ইসহাক (আ.)-এর বংশধরদের মধ্যে ছিলেন ইয়াকুব, ইউসুফ, মুসা, দাউদ, সোলায়মান, ইউনুস, ইলিয়াস, ঈসা (আ.) প্রমুখ নবী ও রাসুল।

মন্তব্য