kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

চাঁদ নির্ণয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসরণে বাধা কোথায়

ইসলামের যাবতীয় বিধান চাঁদ দেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত। চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে শরিয়ত নির্দেশিত সাক্ষীর কথা গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু কখনো কখনো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এবার বাংলাদেশেও শাবান মাসের চাঁদ দেখা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে এর সমাধান করা যায়। এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ আয়োজন

সাখাওয়াত উল্লাহ    

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চাঁদ নির্ণয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসরণে বাধা কোথায়

১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে ওমানে অনুষ্ঠিত সভায় মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী জেদ্দা (বর্তমান নাম মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী আদ-দুয়ালি) দুটি রেজল্যুশন পাস করে।

১. যখন কোনো শহরে (নতুন চাঁদ) ‘দেখা’ সাব্যস্ত হয়ে যাবে, তখন মুসলমানদের জন্য তা মেনে নেওয়া আবশ্যক হবে। উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। কেননা রোজা ও ঈদ পালনের নির্দেশের ক্ষেত্রে সম্বোধন সবার প্রতি।

২. দেখার ওপর নির্ভর করা জরুরি। দেখার সহযোগিতার জন্য জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় হিসাব কিংবা দূরবীক্ষণযন্ত্রের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, যাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা দুইয়ের প্রতিই লক্ষ রাখা যায়। (মাজাল্লাতু মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী, সংখ্যা ৩, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৮৫)

মাজমাউল ফিকহের এই রেজল্যুশনে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে ইসলামী চান্দ্রমাস প্রমাণের ভিত্তি চাঁদ দেখার ওপর। জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় হিসাবের সাহায্যে গণনা করে মাসের শুরু নির্ধারণ করা যাবে না। তবে হিসাব থেকে এতটুকু সাহায্য নেওয়া যাবে যে কোন রাতে, কোন জায়গায়, কতক্ষণের জন্য নতুন চাঁদ দেখতে পাওয়া সম্ভব আর কোথায় সম্ভব নয়।

আল মাজমাউল ফিকহি আল ইসলামী মক্কা মুকাররমা কর্তৃক ১১-১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় চাঁদ দেখা নিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। সৌদি আরবের ভেতরের ও বাইরের বিভিন্ন শরিয়াহ বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ আলেম ও জ্যোতিঃশাস্ত্রবিদ এতে অংশগ্রহণ করেন। খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে চান্দ্রমাসের সূচনা ও সমাপ্তি নির্ধারণের মাপকাঠি নতুন চাঁদ দেখা; তা খালি চোখে কিংবা দূরবীক্ষণযন্ত্র ও জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় সরঞ্জামের সাহায্যে হলেও। নতুন চাঁদ যদি দেখা না যায়, তাহলে রোজা ৩০ দিন পূর্ণ করা হবে।

জ্যোতিঃশাস্ত্রীয় গণনা একটি স্বতন্ত্র বিদ্যা। এর নিজস্ব মূলনীতি ও নিয়ম-কানুন রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর সিদ্ধান্ত ও সমাধান গ্রহণ করা সমীচীন। যেমন—চন্দ্র ও সূর্যের সম্মিলনের সময়কাল, চাঁদ সূর্যগোলক অদৃশ্য হওয়ার আগে অদৃশ্য হলো নাকি পরে অদৃশ্য হলো এবং সূর্যের সঙ্গে সম্মিলন-পরবর্তী রাতে দিগন্তে চাঁদের উচ্চতা কতটুকু হবে ইত্যাদি। তবে জ্যোতির্বিদ্যার স্বীকৃত বাস্তবতার আলোকে জানা যায়, নিয়ম অনুসারে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। যেমন—(চাঁদ ও সূর্যের) ঠিক সম্মিলনের মুহূর্তে কিংবা সূর্য অস্তগামী হওয়ার আগে চাঁদ অস্তমিত হওয়ার অবস্থায় নতুন চাঁদ দেখা যাওয়া সম্ভব নয়। (মাসিক আল কাউসার : বর্ষ ১১, সংখ্যা ১১)

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হলো, কোনো অঞ্চলের উদিত চাঁদ তার আশপাশের ৫৬০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে দেখা সম্ভব। এমন দূরত্বের অধিবাসীরা ওই চাঁদের হিসাব অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, সূর্যাস্তের পর একটি নতুন চাঁদ তার উদয়স্থলে দৃশ্যমান থাকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। সুতরাং পার্শ্ববর্তী কোনো এলাকার সময়ের পার্থক্য যদি ৩০ মিনিট হয়, তাহলে সেখানে এক দিন পরও চাঁদ দেখা যেতে পারে। (www.moonsighting.com)

ধরুন, আমেরিকায় (জিএমটি-৬) চাঁদ উঠেছে কি না তা জানতে কোরিয়ার (জিএমটি-৯) মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ আমেরিকায় সন্ধ্যা ৬টায় উদিত হওয়া চাঁদের সংবাদ কোরিয়ার মুসলমানরা পাবে স্থানীয় সময় পরদিন সকাল ১১টায়। এ অবস্থায় তাদের ‘একই দিনে রোজা ও ঈদ’ উদ্‌যাপনের মূলনীতি অনুসারে ওই রোজা আদায় করার সুযোগ নেই। আরো পূর্বের দেশ নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আমেরিকার সর্বপশ্চিম তথা আলাস্কার সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহলে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী পাবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের উপায় কী হবে? এমনকি বাংলাদেশেও আমেরিকায় চাঁদ ওঠার সংবাদ জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত। অর্থাৎ সেই একই ঘটনা। তারা সেদিনের রোজাও পাবে না, তারাবিও পাবে না।

মন্তব্য