kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

যেভাবে তাফসিরশাস্ত্রের বিকাশ ঘটে

মুফতি তাজুল ইসলাম   

২২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেভাবে তাফসিরশাস্ত্রের বিকাশ ঘটে

উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) কোরআন অধ্যয়নের একটি মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যথাসম্ভব তাফসির পাঠ না করে কোরআনের আয়াত ও মর্ম নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা উচিত। তিনি মনে করেন, প্রতিটি তাফসির নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে। তাই কোরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা না করে শুধু তাফসির পাঠ করা সমীচীন নয়। তাঁর এই কথা সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও তাৎপর্যহীন নয়। প্রথমত, মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি তাফসির রচিত হয়েছে নির্দিষ্ট চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে। এর ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। তাই তাফসির পাঠ করতে হবে চোখ-কান খোলা রেখে, যাতে তাফসিরের নামে রচিত নিজস্ব দর্শনের মাধ্যমে পাঠক প্রভাবিত না হয়। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, কোরআনের বস্তুবাদী ও সুফিবাদী কিছু ‘তাফসির’ও বাজারে পাওয়া যায়। অথচ সেগুলোর সঙ্গে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর আকিদা-বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এগুলোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে কোনো স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত আলেমের তত্ত্বাবধানে তাফসির পাঠ করা উচিত।

তৃতীয়ত, কোরআনের তাফসির পাঠ করার আগের একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের যুগে কোরআনের তাফসির বলতে শুধু শাব্দিক অনুবাদ বা ব্যাখ্যা ছিল। কোনো শব্দের অর্থ বোধগম্য না হলে তা অন্য শব্দ বা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হতো। এর একটি প্রমাণ তাফসিরে ইবনে আব্বাস (রা.)। যদিও বর্তমানে বিদ্যমান এই তাফসির আদৌ তাঁর রচিত বা নির্দেশিত কি না তা নিয়ে বিরোধ আছে। কিন্তু এটি দেখলে বোঝা যায় যে ইসলামের প্রথম যুগে তাফসির বলতে শুধু শাব্দিক অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু পরবর্তী যুগে তাফসিরের ধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তাফসির

বেশির ভাগ তাফসিরবিদের অভিমত, মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে পুরো কোরআনের তাফসির প্রমাণিত নয়। আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) লিখেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যেসব আয়াতের তাফসির জিবরাঈল (আ.) শিখিয়ে দিতেন, তিনি শুধু সেগুলোরই তাফসির পেশ করতেন।’

আল্লামা খুভি (রহ.)-এর মতে, ‘একমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) ছাড়া সন্দেহাতীতভাবে কারো পক্ষে কোরআনের তাফসির করা সম্ভব নয়। আর তা শুধু স্বল্পসংখ্যক আয়াতের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কোরআন গবেষণায় উৎসাহী করার জন্যই এ হিকমত অবলম্বন করেছেন।’ (আল ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৪-১৭৫)

এই আলোচনা থেকে জানা যায়, মহানবী (সা.)-এর যুগে তাফসিরশাস্ত্রের উৎপত্তি হলেও সেটি ছিল সীমিত পর্যায়ে।

 

সাহাবায়ে কেরামের যুগে তাফসির

মহানবী (সা.)-এর পর সাহাবায়ে কেরামের যুগে তাফসির আরো বিস্তৃত হয়। তাঁদের সবার ভাষা আরবি হলেও তাঁদের সবাই কোরআনের ব্যাখ্যা দিতেন না। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মাত্র ১০ জন আক্ষরিক অর্থে তাফসিরবিদ ছিলেন। তাঁরা হলেন—চার খলিফা, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, উবাই ইবনে কাব, জায়েদ বিন সাবেত, আবু মুসা আশআরি, আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) প্রমুখ।

তবে খণ্ডিতভাবে তাঁদের ছাড়াও আরো কয়েকজন সাহাবি থেকে বিভিন্ন আয়াতের তাফসির পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন—আনাস ইবনে মালেক, আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস, আয়েশা (রা.) প্রমুখ।

সাহাবায়ে কেরামের তাফসিরের বৈশিষ্ট্য হলো—

এক.  তাঁদের ভাষা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষা ছিল।

দুই.  তাঁরা সব আয়াতের তাফসির করেননি। কোরআনের যে অংশ বোধগম্য হতো না, শুধু সেই অংশের তাফসির করেছেন।

তিন.  সাহাবিরা সাধারণত সংক্ষিপ্ত অর্থের ওপর নির্ভর করতেন।

চার.  তাঁরা মূলত শব্দের অর্থ জেনে নিতেন।

পাঁচ. তাঁদের ব্যাখ্যায় ফিকহশাস্ত্রের আলোচনা স্থান পেত না।

ছয়. তাঁদের তাফসিরের কোনো লিখিত রূপ ছিল না।

 

তাবেয়িদের যুগে তাফসির

তাবেয়িদের যুগে তাফসিরশাস্ত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল—

এক.  তাবেয়িদের যুগে তাফসিরের মধ্যে ইসরায়েলি বর্ণনা, তথা আগের আসমানি কিতাবের বিভিন্ন কথা ঢুকে পড়ে। এর কারণ হলো, তখন আহলে কিতাবের অনেকে ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়।

দুই.  এ যুগে তাফসিরশাস্ত্রের বিকাশে সনদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

তিন.  এ যুগে তাফসিরের মধ্যে মাজহাবকেন্দ্রিক চিন্তাধারা ঢুকে পড়ে।

চার.  তাফসিরের মধ্যে ফিকহি আলোচনা স্থান পায়।

 

যেভাবে তাফসির সংকলিত হয়

তাফসির সংকলনের প্রথম ধাপ ছিল বর্ণনাক্রমিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবি, সাহাবি থেকে তাবেয়ি, তাবেয়ি থেকে তাবেতাবেয়ি বর্ণনাক্রমে সংকলনের প্রথম ধাপ শুরু হয়। দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় ওই বর্ণনাগুলো ‘কিতাবুত তাফসির’ নামে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে রূপদানের মাধ্যমে। তৃতীয় পদক্ষেপ হচ্ছে সংকলিত অধ্যায়গুলোর আলোকে পবিত্র কোরআনের সুরা ও আয়াতের ধারাবাহিকতা অনুসারে তাফসির করে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে। (আত তাফসির ওয়াল মুফাসসিরুন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪১)

এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ইবনে মাজাহ (মৃত : ৩২৭ হিজরি), ইবনে জারির তাবারি (মৃত : ৩১৮ হিজরি), ইবনে আবি হাতেম (মৃত : ৩২৭ হিজরি), ইবনে জুব্বান (মৃত : ৩৬৯ হিজরি), ইবনে মারদুবিয়্যাহ (মৃত : ৪১০) প্রমুখের নাম স্মরণীয়।

 

সর্বপ্রথম কে তাফসির রচনা করেছেন

সর্বপ্রথম কে তাফসির রচনা করেছেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতপার্থক্য রয়েছে। ইবনে নাদিম উল্লেখ করেছেন যে আল ফাররাহ (মৃত : ২১৭ হিজরি) সর্বপ্রথম সুরাগুলোর ক্রমানুসারে পবিত্র কোরআনের তাফসির রচনা করেন। আধুনিক গবেষক ড. আহমদ আমিন তাঁর এ অভিমতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও ইতিহাসবিদ ইবনে খাল্লিকানের মতে, মালেক ইবনে জুবায়ের (রহ.) সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থ রচনা করেন। তবে কারো কারো মতে, মোতাজিলা সম্প্রদায়ের পণ্ডিত আমর ইবনে আবি উবায়দা সর্বপ্রথম তাফসির গ্রন্থ রচনা করেন।

 

তাফসিরের প্রকারভেদ

তাফসির তিন প্রকার—

এক.  তাফসির বির রিওয়াইয়াহ। কোরআন, হাদিস ও সাহাবিদের বর্ণনার আলোকে কোরআনের যে তাফসির করা হয়, তাকে তাফসির বির রিওয়াইয়াহ বলা হয়; যেমন—তাফসিরে তাবারি, ইবনে কাসির, আল-বাহরুল মুহিত ইত্যাদি।

দুই.  তাফসির বিদ-দিরাইয়াহ। বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় রচিত কোরআনের তাফসিরকে তাফসির বিদ-দিরাইয়াহ বলা হয়। এ ধরনের তাফসিরের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইমাম রাজি (রহ.)-এর তাফসিরে কাবির। তবে ভাষাজ্ঞান ও ইসলামের বিধানাবলি সম্পর্কে অজ্ঞ কোনো ব্যক্তির জন্য এ ধরনের তাফসির করার কোনো অধিকার নেই। বরং সেটা হবে তাহরিফ বা কোরআনের অপব্যাখ্যা।

তিন.  তাফসির বিল ইশারাহ। কোরআনের বাহ্যিক অর্থ ও ব্যাখ্যার বিপরীতে রহস্য উদ্ঘাটন কিংবা সুফিবাদ ও মারেফাতের নামে যেসব ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে তাফসির বিল ইশারাহ বলা হয়।

কাজেই শুধু তাফসির লেখা দেখেই কোনো গ্রন্থ পাঠ করা উচিত নয়। বরং এর লেখক ও লেখার বিষয়বস্তু দেখে প্রয়োজনে কোনো আলেমের শরণাপন্ন হয়ে তা পাঠ করা উচিত।

মন্তব্য