kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

ভিডিও গেম : অন্ধকার ভবিষ্যতে শিশু-কিশোরের পথযাত্রা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

২০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভিডিও গেম : অন্ধকার ভবিষ্যতে শিশু-কিশোরের পথযাত্রা

সন্তানদের অসৎ সঙ্গ ও মাদক থেকে বাঁচাতে চিন্তিত প্রত্যেক মা-বাবা। ফলে শিশু-কিশোরদের দুরন্ত কৈশোর আটকা পড়েছে ঘরের কোণে। তাদের মনোযোগ আটকে রাখা হয়েছে কম্পিউটার ও মোবাইল গেমসের ভার্চুয়াল জীবনে। এতে তারা হয়তো পাড়ার অসৎ ছেলেদের সঙ্গ থেকে নিস্তার পেল, কিন্তু আদৌ কি তারা নিরাপদ? বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন।

কারণ বর্তমান যুগের শিশু-কিশোররা বিনোদনের জন্য ইন্টারনেট গেম ও ফেসবুকনির্ভর হয়ে পড়েছে। অথচ ইন্টারনেট আসক্তিকে মাদকের মতোই ভয়াবহ ভাবেন অনেকে। কেউ কেউ এই আসক্তিকে ডিজিটাল কোকেনও বলে থাকেন। এক সাক্ষাৎকারে আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের মনোরোগ বিভাগের প্রধান ডা. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকাসক্তি যেমন ভয়াবহ, ইন্টারনেট, ফেসবুক তেমনি ভয়াবহ। আমরা যেমন মাদকাসক্তিকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে চিন্তা করি বা বলি, সে রকমভাবে ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিস-অর্ডার, ইন্টারনেট অ্যাডিকশন ডিস-অর্ডার সমভাবে আমাদের তরুণসমাজকে ধ্বংস করছে।’

শুধু তা-ই নয়, কম্পিউটার ও মোবাইলের জনপ্রিয় গেমগুলো হতে পারে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকৃতির কারণ। কোনো কোনো গেমে দেখা যায়, প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন গাড়ি নিয়ে রাস্তা, মাঠঘাট পেরিয়ে ছুটে চলতে হয়। বিজয়ী হওয়ার জন্য অন্য প্রতিযোগীকে ধাক্কা মেরে এগিয়ে যেতে হয়। আবার কোনো কোনো গেমে গাড়ির নিচে মানুষ পিষে ফেলা, পথচারীর কাছ থেকে মোটরসাইকেল বা গাড়ি কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ফুটপাতে উঠে পড়া, রাস্তার স্থাপনা ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা, পুলিশ ধাওয়া করলে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করা, দোকান, ব্যাংক লুট করাই হয় গেমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়! এগুলো শিশু-কিশোরদের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

আবার কিছু গেম সাজানো হয়েছে হিংস্রতা, মারামারি, যুদ্ধ, দখল ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দিয়ে, যেগুলোর মূল আকর্ষণই থাকে জঙ্গি স্টাইলে বিভিন্ন বিপজ্জনক সংঘর্ষ। ভয়ংকর এই মরণখেলাগুলো কখন তাদের মগজ ধোলাই করছে তা তারা নিজেরাও জানে না। ফলে সাধারণভাবে শিশু-কিশোরদের মাথায় এই চিত্রগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। তাদের মনে হতে থাকে, বাস্তব জীবনেও যদি এমন দুর্দান্ত মিশন চালানো যেত!

বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা এসব গেম খেলতে অভ্যস্ত এবং চরম নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তারা হিংস্র মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। মনোরোগ চিকিৎসকরা বলেন, মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসাত্মক মনোভাবকে টেনে বের করে আনে এসব গেম। খেলার ছলে প্রশ্রয় দেয় রক্ত, মৃত্যু, খুন ও জয়কে।

গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আন-নুর মসজিদে আধুনিক মারণাস্ত্র হাতে এক খ্রিস্টান সন্ত্রাসীর গেইমিং স্টাইলে হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর আলোচনায় আসে পাবজি নামের একটি অ্যাকশন গেম। অনেকের দাবি, প্রায় তিন মিনিটের এই হামলাটি করা হয়েছিল সহিংস গেম পাবজির অনুকরণে।

হামলাকারী সন্ত্রাসী তার মাথায় লাগানো ক্যামেরা দিয়ে লাইভ সম্প্রচার করেছিল নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড। ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারী গাড়ি থেকে অস্ত্র বের করে গুলি ছুড়ছে। গুলি ফুরিয়ে গেলে ম্যাগাজিন ভরে নিচ্ছে। মসজিদের দরজা, বারান্দা পেরিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মুসল্লিদের হত্যা করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। শহরে  হেঁটে  হেঁটে, রাস্তায় গাড়িতে বসে গুলি ছুড়ে একের পর এক অস্ত্র পাল্টে মানুষ হত্যা করছে।

এর ফলে অনেক দেশেই জোর দাবি উঠেছে ধ্বংসাত্মক গেমটি নিষিদ্ধ করার। এর আগে ভারতের গুজরাটসহ কয়েকটি রাজ্যে পাবজি গেম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে।

এসব তথ্য জানার পর কারো মনে হতে পারে, তাহলে এসব গেম এড়িয়ে অন্যগুলো খেললেই তো হয়। না, কোনো গেমই আমাদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ নয়। শুধু গেম কেন, টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদিনির্ভর কোনো বিনোদনই তাদের জন্য নিরাপদ নয়।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসঘটিত এসব আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল মাদক’! সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) ভিডিও গেমসের প্রতি তীব্র আসক্তিকে বিশেষ এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই অসুখের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গেইমিং ডিস-অর্ডার’ বা ‘গেইমিং রোগ’। (সূত্র : বিবিসি বাংলা অনলাইন, ৩/১/২০১৮ ইং)

তা ছাড়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস আসক্তিতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে চক্ষুরোগীর হার দিন দিন বাড়ছে।

জার্মানিভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলের (ডিডাব্লিউ) তথ্য মতে, যেসব কিশোর-কিশোরী স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটে বেশি সময় কাটায়, তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার রেডিওলজির অধ্যাপক ইয়ুং সুকের নেতৃত্বে একটি গবেষকদল কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে এর প্রমাণ পেয়েছে। (সূত্র : ডিডাব্লিউ ডটকম)

ইলেকট্রনিকনির্ভর এই যান্ত্রিক জীবন আমাদের সন্তানদের বানিয়ে দিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক। তারা পরিবার কিংবা আত্মীয়র সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে গেম, ফেসবুক, কার্টুনে ডুবে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। রাতে দেরিতে ঘুমাচ্ছে, শারীরিক পরিশ্রমের খেলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের পরিবার, পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদত থেকে নিরুৎসাহ হয়ে তারা বড় হচ্ছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘কতক মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য এমন সব কথা কেনে, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য আছে এমন শাস্তি, যা লাঞ্ছিত করে ছাড়বে।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৬)

শুধু তা-ই নয়, গেম ক্যারেক্টার ও কার্টুনের মাধ্যমে ঠাণ্ডা মাথায় ছড়ানো হয় নগ্নতা। যেহেতু শিশুদের অবচেতন তুলনামূলক বেশি কাজ করে, ফলে তাদের মস্তিষ্ক তা সহজেই রেকর্ড করে রেখে দেয়। বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য ভিডিওটি দেখতে পারেন। (https://youtu.be/qY-ixmcI-5c)

এ ছাড়া প্রতিটি গেমে গান-বাজনা বা মিউজিক্যাল সাউন্ড তো থাকছেই, যা সম্পূর্ণ হারাম। এগুলোর মাধ্যমে ছোটবেলা থেকে শিশু-কিশোরদের কচি মনে অশ্লীলতার বীজ বপন করে দেওয়া হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২৯)

তাই আসুন, আমরা সবাই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যাপারে সচেতন হই। সন্তানদের সময় দিই। ছোটবেলা থেকেই তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন করি এবং তাদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

মন্তব্য