kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ইসলামে সাদাসিধে ইফতারের তাগিদ

মুফতি তাজুল ইসলাম   

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসলামে সাদাসিধে ইফতারের তাগিদ

রোজাদার মুসলমান সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ থেকে দূরে থাকে। সূর্যাস্তের পর যেসব খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে রোজা ভঙ্গ করে, তা-ই ইফতার। ইফতার শব্দের অর্থ রোজা ভঙ্গ করা। আরবি ‘ফুতুর’ শব্দ থেকে এটি উদ্ভূত। এর অর্থ নাশতা করা ও হালকা খাদ্য গ্রহণ করা। ইফতার শব্দের অন্য অর্থ বিরতি ও ভঙ্গ করা। শরিয়তের পরিভাষায় সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর রোজা সমাপ্তির জন্য পানাহার করাকে ইফতার বলা হয়।

সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে রাতের আগমন ঘটে। তখন ইফতারের সময় হয়ে যায়। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা হলো, ইফতারে বিলম্ব করা যাবে না। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ যত দিন পর্যন্ত সময় হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ২৮৫২)

মহানবী (সা.) খুবই সাদাসিধে ইফতার পছন্দ করতেন। হজরত আবদুল্লাহ বিন আবি আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রোজায় আমরা রাসুল (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। সূর্যাস্তের সময় তিনি একজনকে ডেকে বলেন, ছাতু ও পানি মিশিয়ে ইফতার পরিবেশন করো।’ (মুসলিম শরিফ,  হাদিস : ১০৯৯)

স্বাভাবিক অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) নামাজ আদায়ের আগে কয়েকটি ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন, যদি ভেজা খেজুর না থাকত, তাহলে সাধারণ শুকনো খেজুরই গ্রহণ করতেন। যদি তা-ও না থাকত, তাহলে কয়েক ঢোক পানিই হতো তাঁর ইফতারি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৬৯৬) তবে তিনি ইফতার না করে মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন না। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ইফতার করা ছাড়া মাগরিবের নামাজ আদায় করতে দেখিনি। এমনকি এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও তিনি ইফতার করে মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৫০৪)

অথচ আমরা সেই নবীর উম্মত হয়ে সাহির ও ইফতারে হয়ে পড়ছি অসংযমী। সমাজে যারা বিত্তশালী, সাহির ও ইফতারে তাদের জন্য ১০-২০ পদ খাবার চাই-ই চাই। অনেকের কাছে আবার রমজান মানে স্রেফ ইফতার পার্টির বিনোদন। রোজা রাখুক বা না রাখুক, ইফতারে তাদের ভোজনবিলাসিতার কমতি নেই। অথচ রমজান ভোজনবিলাসিতার মাস নয়। তবে এটা ঠিক যে সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের জায়গা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতারে রয়েছে বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের ইফতারে থাকে খেজুর, পেঁয়াজু, বেগুনি, হালিম, আলুর চপ, জিলাপি, মুড়ি ও ছোলা। একটু ব্যতিক্রমী হলে থাকে ফিশ কাবাব, মাংসের কিমা ও মসলা দিয়ে তৈরি কাবাবের সঙ্গে পরোটা, মিষ্টি ও ফল। শরবতসহ এসব খাবার এ দেশের ইফতার টেবিলকে দেয় পরিপূর্ণ রূপ। কিছু অঞ্চলে ইফতারের আসরে খিচুড়ি, চিঁড়া ইত্যাদিও শোভা পায়। আবার গ্রামের অনেক নারী ভাত-তরকারি দিয়েই ইফতার করেন। সন্দেহ নেই যে সংস্কৃতিতে ইফতারের বিশেষ প্রভাব আছে। বাংলাদেশে বহু অমুসলিম ইফতারের আয়োজন করে থাকে। অনেক অমুসলিম ব্যবসার তাগিদে ইফতারসামগ্রী তৈরি করে থাকে। হাট-বাজারে, অফিস-আদালতে ও সংঘবদ্ধ কোনো কোনো স্থানে অনেক অমুসলিম মুসলিমদের সঙ্গে ইফতারিতে অংশগ্রহণ করে। এটি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে ইফতার করেছেন, সেভাবে ইফতার করা উত্তম। আমরা যেভাবে ইফতারের সময় খাবারের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, এটি ইসলামের নির্দেশিত ইফতার নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও পুণ্যবান মনীষীরা ইফতারের সময় দোয়া করার প্রতি সর্বাধিক মনোযোগী হতেন। যাঁর নির্দেশে আমি রোজা রাখলাম, সারা দিন পানাহার বর্জন করলাম, তাঁর কাছে আমার কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে। সেই চাওয়া-পাওয়ার মোক্ষম সময় হলো ইফতারের আগমুহূর্ত। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—এক. ন্যায়পরায়ণ শাসক; দুই. রোজাদার, যখন সে ইফতার করে; তিন. মজলুমের বদদোয়া।’ (তিরমিজি : ১০/৫৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৫২)

কাজেই ইফতারের আগমুহূর্তে বেশি বেশি দোয়ায় মনোনিবেশ করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় ইফতার করার তাওফিক দান করুন। আমাদের সাহির, ইফতার, রোজা ও তারাবি কবুল করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম, টঙ্গী, গাজীপুর

মন্তব্য