kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

শারীরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা পূরণ করাও স্বামীর দায়িত্ব। এর জন্য নির্ধারিত সময় ধার্য নেই; বরং চাহিদা, শারীরিক সক্ষমতা ইত্যাদি অনুপাতে করতে হবে। তবে দীর্ঘদিন বিরত থাকাও নিষেধ। ওমর (রা.) একদা রাতের বেলা একটি ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলেন যে জনৈক মহিলা বিরহের কবিতা পড়ছে। তখন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে যে তার স্বামী দীর্ঘদিন জিহাদে রত, বাড়িতে আসছে না। তখন ওমর (রা.) হাফসা (রা.)-কে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে নারী স্বামীবিহীন কত দিন ধৈর্য ধারণ করতে পারে? হাফসা (রা.) লজ্জায় বলতে চাচ্ছিলেন না। তখন ওমর (রা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা হক কথায় লজ্জা করেন না। তখন হাফসা (রা.) ইশারায় তিন বা চার মাসের কথা বলেন। অতঃপর ওমর (রা.) সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন যে চার মাসের বেশি যেন কোনো সৈন্যকে আটকে রাখা না হয়; বরং অনূর্ধ্ব চার মাস পর পর তাদের ছুটি দেবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১২৫৯৩)

উক্ত ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে স্বাভাবিকভাবে চার মাসের বেশি স্ত্রী সহবাস থেকে কখনো বিরত থাকবে না। আর এ পরিমাণটি কোরআনে কারিমের (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৬) ‘ঈলা’-এর বিধান (অর্থাৎ চার মাস স্ত্রী সহবাস না করার কসম করে বিরত থাকলে তালাক হয়ে যায়) দ্বারাও এটি প্রমাণিত।

এ ব্যাপারে আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা অনেক উদাসীন। ফলে তাদের মধ্যে কারো কারো পারিবারিক জীবন সুখকর নয়। তবে তা সত্ত্বেও অনেকে পারিবারিকভাবে সুখী। কেননা মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে পারিবারিক বন্ধন খুবই শক্তিশালী। প্রবাসীরা সীমাহীন কষ্ট করে পরিবারের জন্য, দেশের জন্য যে অবদান রাখছেন, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য।  

জৈবিক চাহিদা ও স্ত্রীর অধিকার

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে প্রয়োজনমাফিক জৈবিক চাহিদা তথা সহবাসের চাহিদা পূরণ করা যেরূপ স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার, তদ্রূপ তা স্ত্রীর ওপরও স্বামীর একটি বৈধ ও প্রয়োজনীয় অধিকার। জৈবিক চাহিদা পূরণে স্বামী যখনই ডাকবে, শরয়ি ওজর অথবা অসুস্থতা ইত্যাদি না থাকলে স্ত্রীর তাতে সাড়া দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে অবহেলা করা গুনাহ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যখন কোনো স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে, তখন স্ত্রীর জন্য তার ডাকে সাড়া দেওয়া জরুরি, যদিও সে চুলার কাজে ব্যস্ত থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১১৬০)

তবে স্মর্তব্য যে এ ক্ষেত্রে উভয়েই উভয়ের চাহিদা, সক্ষমতা ও মনমানসিকতা বিবেচনা করা জরুরি। তাই এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়ত স্বামীকেও নির্দেশ দেয় যে সে স্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেও গুরুত্ব দেবে। তাই স্ত্রীর চাহিদা হলেও স্বামী কোনো ওজর না হলে তার চাহিদা পূরণ করতে হবে। এমনকি স্ত্রীদের অধিকারের দিকে লক্ষ রেখে এ বিধানও দেওয়া হয়েছে যে সহবাসকালীন স্ত্রীর অনুমতিবিহীন স্বামী বীর্য প্রত্যাহার করতে পারবে না। হাদিস শরিফে এসেছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের স্ত্রী সহবাসে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বীর্য প্রত্যাহার করা থেকে নিষেধ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৯২৮)

কেননা এতে স্ত্রীর যৌন অধিকার হরণ হয়ে থাকে এবং অতৃপ্তি থেকে যায়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যদি একে অপরের অনিচ্ছায় সহবাসের চাহিদা পূরণ করতে চায়, চাই সে স্বামী হোক বা স্ত্রী হোক—এটা অপরাধ বা তিরস্কারের বিষয় নয়। কেননা উভয়ে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হওয়ায় তাদের পরস্পরে কখনো এমনটি হয়ে যাওয়া আশ্চর্যের বিষয়ও নয় এবং এতে তারা বাদে অন্য কারো নাক গলানো বা মাথা ঘামানোর বিষয়ও নয়। যেমন আমরা দেখি, বন্ধু-বান্ধবরা পরস্পরে অনেক সময় একজন-আরেকজনের থেকে জোরপূর্বক নাশতা আদায় করে আনন্দ উপভোগ করে থাকে, কারো ক্ষতি না হলে সামাজিকভাবে এটি কোনো নিন্দনীয় বিষয় নয়। এমনকি শরিয়তও বন্ধুর থেকে এভাবে চেয়ে খাওয়াটাকে নিন্দনীয় বলে না, কেননা বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে এমন কিছু হতেই পারে। তদ্রূপ কারো ক্ষতি করা বাদে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ রকম কিছু ঘটে যাওয়াকে কোনোক্রমেই ‘ধর্ষণ’ বলা যায় না। কেননা ধর্ষণ হলো অবৈধ ক্ষেত্রে জোরপূর্বক কারো সঙ্গে ব্যভিচার করা। দুটির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আরেকটি উদাহরণ দিই—অঢেল সম্পত্তির মালিক ছেলে মা-বাবাকে যদিও প্রয়োজনীয় খোরপোশ দেয়; কিন্তু সাধারণ হাতখরচ দেয় না, এ জন্য বাবা ছেলের অজান্তে তার পকেট থেকে কিছু টাকা নিয়ে নিল, তদ্রূপ স্বামীর পকেট থেকে তার অজান্তে স্ত্রী কিছু টাকা নিয়ে নিল, তাহলে এ কাজটি যদিও সামাজিক দৃষ্টিকোণে ভালো নয়, তবে কি এ কাজের জন্য সমাজ ওই বাবা এবং স্ত্রীকে বলবে যে তারা চুরি করেছে? অথবা তাদের কি চোর বা ছিনতাইকারী বলে ডাকা হবে? কখনো না। বরং সমাজের অতিউৎসাহী কেউ যদি এ অপরাধের কারণে তার ছেলের সামনে বাবাকে অথবা স্বামীর সামনে স্ত্রীকে চোর বলে গালি দেয়, তাহলে ওই ছেলে এবং স্বামী তাকে কি বলবে না যে ওই বেটা! এটা আমাদের বাপ-বেটার ঘরোয়া নিজস্ব ব্যাপার, স্বামী-স্ত্রীর ঘরোয়া বিষয়, তোমার এখানে নাক গলানোর কী আছে?

অথচ আজকাল দেখা যায়, পশ্চিমা ও ইউরোপিয়ানদের পা-চাটা কিছু দালাল মিডিয়া এ বিষয়েও সরব, তারা স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত এসব বিষয় নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সহবাসকেও ধর্ষণের মতো জঘন্য নাম দিয়ে কলঙ্কিত করতে চাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্ত্রীদের স্বামীদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া, সুখের সংসারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, তাদের পশ্চিমা গুরুদের ঘরে নারী স্বাধীনতার নামে যে আগুন জ্বলছে, যার প্রভাবে পুড়ছে পুরো পশ্চিমা সমাজ, সে আগুন তারা আমাদের ঘরেও লাগাতে চায়। তারা আমাদের সুখের সংসার দেখে হিংসায় বাঁচে না। আর তাদের আরেকটি হীন-উদ্দেশ্য হলো, মানুষদের বৈধ ও পবিত্র বিবাহের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা এবং অবৈধ প্রেম-প্রীতির রেওয়াজ চালু করা। কুকুরের মতো পথেঘাটে জিনা-ব্যভিচারে অভ্যস্ত করে তোলা, যাতে আমাদের পরিবারব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে অভিশপ্ত সমাজে রূপান্তরিত করতে পারে। তাই তাদের ব্যভিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা যায় না; কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত বৈধ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায়। আমাদের কি হুঁশ ফিরবে না?

মন্তব্য