kalerkantho

ইদরিস (আ.)-এর জাগতিক জ্ঞান

রায়হান রাশেদ   

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইদরিস (আ.)-এর জাগতিক জ্ঞান

ইদরিস (আ.) আল্লাহর প্রেরিত একজন নবী। পৃথিবীর প্রথম সহস্রাব্দে তাঁর আগমন। আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের ৩৮০ বছর আগে ইরাকের প্রাচীন নগরী বাবেল শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বেশির ভাগ সাহাবি (রা.)-এর মতে, তিনি নুহ (আ.)-এর পরের নবী। কিন্তু ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে, তিনি নবী হজরত নুহ (আ.)-এর দাদা।’ ইতিহাসবিদরা এ মতকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। আদম (আ.)-এর পর তিনিই প্রথম নবী ও রাসুল, যাঁর প্রতি আল্লাহ ৩০টি সহিফা (ছোট কিতাব) নাজিল করেছেন।

ইদরিস (আ.)-এর মূল নাম ‘আখনুখ’। ইদরিস তাঁর উপাধি। ইদরিস অর্থ শিক্ষা-শিক্ষকতায় ব্যস্ত ব্যক্তি। যেহেতু তিনি বহুবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, তাই তাকে ইদরিস বা বিদ্যাবিশারদ বলা হয়।

ইদরিস (আ.) এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। মানুষকে এক আল্লাহ ও সত্য ধর্মের প্রতি আহ্বান করতেন। মানুষের হৃদয়ের গভীরে বিশ্বাসের ডাঁটো পাঁজর গড়তে বলতেন। তিনি সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে দিবানিশি মানুষকে সত্যের প্রতি ডাকতেন। তখনকার সময়ের সব মানুষ তাঁর কথা শোনেনি। যাঁরা শুনেছেন, তাঁরা হৃদয় মিনারে গেঁথে নিয়েছিলেন সত্যকে। সত্যের ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন আপসহীন। পৃথিবীর চিরায়ত নিয়মানুযায়ী তখন শুরু হয় সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব। তিনি ছিলেন সত্যের লড়াকু সৈনিক। আল্লাহ বলেন, ‘এই কিতাবে ইদরিসের কথা আলোচনা কোরো, সে ছিল সত্যবাদী নবী। আমি তাঁকে সুউচ্চ আসনে সমাসীন করেছিলাম।’ (সুরা : মারিয়াম, আয়াত : ৫৬-৫৭)

অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ইদরিস (আ.) ও তাঁর সহকর্মীদের ওপর অত্যাচারী হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ তাঁকে হিজরতের নির্দেশ দেন। তিনি নীল নদের তীরে উম্মতদের নিয়ে হিজরত করেন। তিনিই সর্বপ্রথম নবী, যিনি হিজরত করেছেন।

ইদরিস (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অনেক বিজ্ঞানসম্মত কাজের আবিষ্কার হয়। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, সফল রাষ্ট্র পরিচালক, কর্মবীর ও কর্মশিল্পী ছিলেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় ইদরিস (আ.) : আল্লাহর নির্দেশে তিনি হিজরত করে নীল নদের তীরে আসেন। সেখানে এক আল্লাহ বিশ্বাসী মানুষদের নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়ে। সাম্রাজ্য বাড়ে। কাফিরদের এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দেন। যারা শোনেনি, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন শান্তি রক্ষার জন্য। প্রায় যুদ্ধেই তিনি বিজয়ী হন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক আল্লাহ বিশ্বাসী সভ্যতা। সমাজ পূর্ণতা পায় বিশ্বাসী মানুষের বসবাসে। তখন তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের সুষ্ঠু, সুন্দর পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গঠন করেন। তৈরি করেন রাষ্ট্রীয় নীতিমালা। তিনি বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের জন্য তাদের অবস্থা অনুযায়ী আইন-কানুন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ভূমণ্ডলকে চার ভাগে বিভক্ত করে প্রতি ভাগে একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করেন। তাঁরাই ছিল ওই ভূখণ্ডের শাসক ও দায়িত্বশীল।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইদরিস (আ.) : ইদরিস (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে চিকিৎসাশাস্ত্র একটি অবকাঠামোর রূপ পায়। এর আগে চিকিৎসাশাস্ত্রের নির্ধারিত নির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা ছিল না। মানুষ তাদের ইচ্ছামতো অসুস্থতার নিয়ামক খুঁজে নিত। ঘরোয়াভাবে চিকিৎসা চলত। ইতিহাসবিদ আল-কিফতি তাঁর ‘তারিখুল হুকামাত’-এ লিখেছেন, ‘ইদরিস (আ.) হলেন প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানী। এ বিষয়ে তাঁর কাছে ওহি আসে।’ (মুহাম্মদ নূরুল আমীন রচিত ‘বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা ৫৪)

জ্যোতির্বিজ্ঞান : মহাকাশসম্পর্কীয় একটি বিজ্ঞান। Encyclopaedia Britanica লিখেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞান এমন একটি বিজ্ঞান, যাতে নভোমণ্ডলের গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি জ্যোতিষ্কের শ্রেণিবিভাগ, গতি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মধ্যে সম্ভবত এটাই প্রাচীন। কোরআনে আকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র, তাদের গতিপথ, গতিভেদ—সব কিছু স্পষ্ট বর্ণনা হয়েছে। ইদরিস (আ.) এমন এক ব্যক্তি, যাঁকে মুজিজা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অঙ্কবিদ্যা দান করা হয়েছে।’ (তাফসিরে বাহরে মুহিত) সব বিজ্ঞানের সূত্রপাত অঙ্কশাস্ত্র থেকে। আদি যুগ থেকে মানুষের প্রয়োজনে অঙ্কশাস্ত্রের সূচনা হয়। ধারণা করা হয়, সৃষ্টির সূচনা থেকেই অঙ্কশাস্ত্রের আবিষ্কার। আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমেও গণনাসংখ্যার অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। আদিম যুগের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে? তারা বলবে, আমরা অবস্থান করেছিলাম এক দিন বা এক দিনের কিছু অংশ। আপনি না হয় গণনাকারীদের জিজ্ঞেস করুন। তিনি বলবেন, তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে!’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ১১২-১১৪)

লিখনপদ্ধতি : মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটেছে লিখনপদ্ধতির মাধ্যমে। সভ্যতা আর সংস্কৃতির সন্ধান মিলেছে এর মাধ্যমে। পৃথিবীর গত হওয়া ইতিহাস, হারিয়ে যাওয়া দিনের খোঁজ জানা গেছে এই লিখন পদ্ধতির মাধ্যমে।  ইদরিস (আ.) প্রথম মানব, যিনি কলমের সাহায্যে লিখন পদ্ধতির কাজ শুরু করেন। এর আগে কলমের ব্যবহার হয়নি। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা ৮৩৮)

বস্ত্র সেলাই শিল্প : সূচনায় লতাপাতা ছিল মানুষের পোশাক। গাছের পাতা, গাছের কাণ্ডের বাকল দিয়ে মানুষ তাদের ইজ্জত-আব্রুর হেফাজত করত। অনেকে জীবজন্তুর চামড়া দিয়ে তৈরি সেলাইবিহীন পোশাক পরিধান করত। আজকের পৃথিবীর মানুষদের মতো তখনকার মানুষদের কোনো পোশাক ছিল না। কেউ সেলাই করে কাপড় পরিধান করত না। সেলাইবিহীন ছিল তাদের পোশাক। ইদরিস (আ.) প্রথম সেলাই করা কাপড় পরিধান করেন। তিনি নিজেই নিজের কাপড় সেলাই করতেন। তিনি ছিলেন জগতের প্রথম দর্জি। তিনি মানুষের কাপড়ও সেলাই করতেন। ধারণা করা হয়, তিনি কোনো মজুরি নেননি। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন : ৮৩৮) 

লোহার অস্ত্র : লোহা দ্বারা অস্ত্রশস্ত্র তৈরির পদ্ধতি তিনিই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। বিভিন্ন কাজের জন্য লোহার ব্যবহার তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়। মানুষের প্রয়োজনীয় নানা কাজের সহজলভ্যতার জন্য ব্যবহার করা হতো লোহা দিয়ে তৈরি অস্ত্র। তাঁর তৈরি করা অস্ত্রের সাহায্যে কাবিল গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এবং তিনি বিজয় লাভ করেন।

ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি : মানুষের জীবন পরিচালনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ওজন ও পরিমাপ। মানুষের মধ্যে পরস্পরের লেনদেন, বস্তু আদান-প্রদান, পণ্য বেচা-কেনার জন্য ওজন জরুরি। ওজন ও পরিমাপ ছাড়া মানুষের সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতি সুন্দরভাবে চলতে পারে না। সঠিক পরিমাণে আদান-প্রদান করতে পারে না তাদের মালপত্র। ইদরিস (আ.) আবিষ্কার করেন ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি।

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা আজকের বিশুদ্ধ উন্নত সভ্যতার আবিষ্কারক। তাঁদের পবিত্র হাতেই নির্মিত হয়েছে সভ্যতার চূড়ান্ত ইতিহাস। তাঁরা পৃথিবীকে দিয়ে গেছেন অভূতপূর্ব উপহার। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

মন্তব্য