kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ভাটি বাংলার বিস্ময় উকিল মুন্সি

আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘সুয়াচান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ না কি.....’ বা ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে.....’ অথবা ‘সুজন বন্ধু রে আরে ও বন্ধু, কোন বা দেশে থাকো...’ বা ‘আমার কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি...’ ইত্যাদির মূর্ছনা আজও স্মরণ করিয়ে দেয় উকিল মুন্সি নামের একজন মরমি সাধকের কথা। আধ্যাত্ম ও মানবিক আবেগ উকিল মুন্সির স্মৃতি ও কর্মকে করেছে রহস্যাবৃত। তাঁর গুরু ছিলেন বাউল রশিদ উদ্দিন। ১৯১৫ সালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর গ্রামের তিনি যেমন মসজিদের ইমাম ছিলেন, ছিলেন একজন মরমি সাধক। তিনি স্থানীয় মক্তবের সব শিশুকে সন্তানতুল্য ভালোবাসায় তালিম দিয়েছেন পবিত্র কোরআন-হাদিস। কেউ মারা গেলে জানাজার জন্য উকিল মুন্সির ডাক পড়ত।

উকিল মুন্সির আচরণ-বিচরণ বেশির ভাগ প্রথাবিরুদ্ধ হলেও তিনি তাঁর সাধনা ও ব্রতে ছিলেন অবিচল। তিনি ইমামতির পাশাপাশি মারফতি গান—গজল রচনা করতেন। রাত জেগে মেতে উঠতেন তাঁর আধ্যাত্মিক আবাহনে। এতে বিরক্ত এলাকাবাসী উকিলের বিরুদ্ধে পুলিশে খবর দেয়। ধরা খেয়ে, উকিল পুলিশ নিয়ে তাত্ক্ষণিক গান রচনা করে গাইতে শুরু করেন। উকিলের গান শুনে পুলিশ তাঁর নিজের ভেতরের লুকানো কিছু প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায়। এরপর উকিল মুন্সির কারামতি ও আরো কিছু মরমি গানে অভিভূত হয়ে পুলিশ তাঁর মুরিদ হয়ে যায়।

উকিল মুন্সি ছিলেন আল্লাহ-রাসুল, প্রেম-ভালোবাসাকে উপজীব্য করে বিচ্ছেদ-বর্ণনায় এক অসাধারণ কিংবদন্তি। ফলে ‘হাওর-জঙ্গল মৈষের (মহিষ) শিং’খ্যাত বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা ভাটি বাংলার জাতি, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা ভেদাভেদহীন সবার কাছে উকিল মুন্সি হয়ে ওঠেন এক মুকুটবিহীন আধ্যাত্মিক সম্রাট। তাঁর গভীর উপলব্ধির প্রকাশ : ‘...ভবদরিয়ায় ঢেউ দেখিয়া/প্রাণ আমার উঠে কাঁপিয়া/সামনে ভীষণ আঁধার দেখা যায়।’

সাধারণ পাড়াগাঁয়ের একজন মসজিদের ইমাম, যাঁর পেছনে সবাই নামাজ পড়েন। আবার রাতভর তাঁর আধ্যাত্মিক গানে বেদনার সায়রে নিমজ্জিত হন সবাই, কান্নায় বুক ভাসান! এমন দুর্লভ ঘটনা হয়তো প্রথম এবং শেষ, বলা চলে মরমি সাধক উকিল মুন্সির বেলায়ই।

১৯৯৯ সালে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’ বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে ব্যবহার করেছেন উকিলের গান। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ওই গানের কারণে উকিল মুন্সিকে নিয়ে নতুন এক অধ্যায় সূচিত হয়। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’র অন্যতম চরিত্রও এই উকিল মুন্সি।

কে এই উকিল মুন্সি, জানতে হলে আমাদের যেতে হবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে। নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার নূরপুর বোয়ালি গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন জন্মগ্রহণ করেন এক সরলপ্রাণ মরমি পুরুষ। তিনিই বিখ্যাত উকিল মুন্সি। গৃহশিক্ষকের কাছে তিনি শৈশবেই বাংলার পাশাপাশি আরবি, ফারসি ও পবিত্র কোরআনের তালিম নেন। তাঁর প্রকৃত নাম আব্দুল হক আকন্দ। তাঁর পিতার নাম গোলাম রসুল আকন্দ ও মাতা উকিলেন্নেসা। বড় হলে জজ আর না হয় উকিল-মোক্তার হবেন—এমন স্বপ্ন নিয়ে মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হয়। অথচ তিনি বাস্তবে হলেন মসজিদের ইমাম, তখন তাঁর নাম হলো উকিল মুন্সি। শিশুকালেই তিনি পিতাকে হারান এবং পরে তাঁর মায়েরও অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। তখন তাঁর বয়স ১৫-১৬ মাত্র। চির আবেগী উকিল নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন এক অনন্য সংগ্রামী মানুষরূপে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তিনি জীবনের রং-রূপ আস্বাদন করেছেন অসাধারণ স্বাধীন মানুষের যোগ্যতায়। তিনি শৈশবে গ্রাম্য পালাগানে যোগ দেন। তরুণ বয়সে গজল রচনা শুরু করেন এবং পরিণত বয়সে তিনি মরমি সাধনায় নিজেকে বিলিয়ে দেন।

উকিল মুন্সি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর রচিত ও মাঝিমাল্লার কণ্ঠে গীত কতগুলো জনপ্রিয় ধর্মীয় সংগীত। যেমন—‘দীন দুনিয়ার বাদশা তুমি, উম্মতের জামিন/খাতামুন নাবিইন।...তুমি রবি, তুমি শশী, তুমি মক্কা, তুমি মদিনা/তোমার লাগি পেরেশানি, আসমান আর জমিন।/বৃক্ষ আদি তরুলতা, পাহাড় পর্বত সাগর গোহায়/খাছ নাম তোমার কালামুল্লাহ সুরায়ে ইয়াছিন।’

ভাটি বাংলার অহংকার, মরমি সাধক, মুকুটবিহীন সম্রাট উকিল মুন্সি ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হামিদা খাতুনের (লাবুসের মা) মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকে সইতে হয় প্রিয় পুত্র আব্দুস সাত্তারের মৃত্যুশোক। এমন বিচ্ছেদজ্বালা, রোগ-শোক ও বার্ধক্যের কাছে হার মেনে তিনিও না ফেরার দেশে চলে যান ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর। উকিলের বয়স তখন ৯৩ বছর। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুরে বেতাই নদীর পারে প্রিয় পুত্রের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন গণনন্দিত আধ্যাত্মিক পুরুষ, ভাটি বাংলার মরমি সাধক আব্দুল হক আকন্দ উকিল মুন্সি। চিরন্তন ভালোবাসার অতন্দ্র প্রহরীর মতো, ওই সমাধির পাশে জেগে আছেন আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী ফুলবানু। তাঁর স্বামী-শ্বশুর এখানেই শুয়ে আছেন। আজও আধ্যাত্ম ক্ষুধাতুর কেউ কান পাতলেই শুনবেন, ওই সমাধি থেকে ভেসে আসছে—‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়/বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়।/...বিচ্ছেদের বাজারে গিয়া তোমার প্রেম বিকি দিয়া/করবো না প্রেম আর যদি কেউ কয়...।’

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।



সাতদিনের সেরা