kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা নিয়ে অপপ্রচার

কাসেম শরীফ   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা নিয়ে অপপ্রচার

ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। এর স্বরূপ ও ব্যাখ্যা বঙ্গবন্ধু নিজেই বলে দিয়ে গেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও এটা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। গোড়া থেকেই ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলো এই ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নিতে পারেনি। সর্বত্র তারা এ আওয়াজ চাউর করে দিয়েছে যে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ‘ধর্মহীনতা’। অথচ বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মূলে ছিল ধর্মীয় সহাবস্থান। এটা সর্বতোভাবে ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশনার অনুগামী। সেদিকে তাদের লক্ষ না করার কারণ রাজনৈতিক। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, অনেক ইসলামবিদ্বেষীর তা ভালো লাগেনি। তাই তারা ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন নতুন ব্যাখ্যা বলে বেড়ায়। ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ‘সেক্যুলারিজম মানে সত্যি সত্যি ধর্মের অস্তিত্বহীনতা—ধর্মনিরপেক্ষতাও নয়।’ (আহমদ শরীফ, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত প্রবন্ধসমূহ, অনন্যা, বাংলাবাজার, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা ১১১)

১৯৭২-এর সংবিধানে Secularism শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, এতটুকু সত্য। কিন্তু এর অনুবাদে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু নিজে এর বিশেষ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর সদিচ্ছার স্বরূপ পাওয়া যায়। তিনি Secularism শব্দ ব্যবহার করে এ দেশে ধর্মহীনতা বা তথাকথিত নাস্তিকতার বীজ রোপণ করতে চাননি। তিনি চেয়েছেন, পাকিস্তানিদের মতো কেউ যেন ধর্মের নামে মানুষকে ধোঁকা দিতে না পারে। অন্যদিকে বামপন্থীদের Secularism-এর ব্যাখ্যা ছিল অন্য ধরনের। আজও তারা বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেনি। এখনো তারা বলে বেড়ায়—Secularism হলো ধর্মবিযুক্ত বা ধর্মহীনতা কিংবা ইহজাগতিকতা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ রাষ্ট্রের ধর্মহীনতা; দার্শনিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থটি হলো ইহজাগতিকতা। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইংরেজিতে বলে সেক্যুলারিজম। ধারণাটি ইউরোপ থেকেই এসেছে, সেক্যুলারিজম নামটিও সেখানকারই, সেক্যুলারিজমের বাংলা ইহজাগতিকতাই সংগত হতো।’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম, রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪)

বামপন্থী লেখক আবদুল মতিন খান লিখেছেন, ‘ওই সংবিধানে সেক্যুলারিজম শব্দটি থাকলেও এর বাংলা করা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা, যদিও সেক্যুলারিজম শব্দের অর্থ ইহজাগতিকতা।’ (আবদুল মতিন খানের কলাম, ‘বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম  ও গণতন্ত্র’, দৈনিক যায়যায়দিন, ২০ নভেম্বর ২০১২)

আরেকটু আগ বাড়িয়ে বদরুদ্দীন উমর প্রায়ই সেক্যুলারিজম  শব্দের অর্থ করে থাকেন ‘ধর্মবিযুক্ত’—অর্থাৎ ধর্মযুক্ত নয় এমন বা ধর্মহীন। তাঁর একটি কলামের শিরোনাম হলো, ‘আওয়ামী লীগের ধর্মবিযুক্ত রাজনীতির স্বরূপ’। (দৈনিক সমকাল : ২০ নভেম্বর ২০১২)

গোড়া থেকেই বামপন্থীরা বঙ্গবন্ধুর Secularism-এর ব্যাখ্যাকে সন্দেহের চোখে দেখত। তারা এটাকেও ‘রাজনীতি’ হিসেবে দেখত। ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ‘আমাদের এখানে Secularism শব্দটা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয় আওয়ামী লীগের আমলে, মানে ১৯৭২ থেকে। সেদিন প্রথমেই যখন Constitution-এর মতো একটা পবিত্র দলিল তৈরি করতে যাচ্ছিলেন, যাঁরা করছিলেন, যাঁদের নির্দেশে করা হচ্ছিল, তাঁদের মধ্যে কোনো সততা ছিল না। তাঁরা সেই দিনও মতলবে পড়ে ধূর্ততার পরিচয় দিয়েছিলেন।’ (আহমদ শরীফ, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত প্রবন্ধসমূহ, অনন্যা, বাংলাবাজার, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা ৯৫)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সম্ভব হয়নি। সম্ভব যে হবে না, তার লক্ষণ একেবারে শুরুতেই দেখা দিয়েছিল—ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যখন করা হলো সব ধর্মের অবাধ অর্থাৎ আরো বেশি চর্চা। ইহজাগতিকতার চর্চা এগোল না সেই তুলনায়।’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কলাম, মৌলবাদের শক্তি কোথায়, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৯ আগস্ট ২০১৩)

স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার যে ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন, তাতে কট্টর ডানপন্থী ও বামপন্থীরা সন্তুষ্ট হয়নি। আর স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি সর্বাত্মকভাবে বঙ্গবন্ধুর বাতলে দেওয়া ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এ বিষয়ে যারা অপপ্রচার চালায়, তাদের বিরুদ্ধেও টুঁ শব্দ করেনি। বড়ই আশ্চর্যের বিষয়! আসলে বঙ্গবন্ধু Secularism-এর কথা বললেও সেটি কিছুতেই ইউরোপের ধ্যান-ধারণার Secularism ছিল না। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন ধর্মীয় সহাবস্থান। যেভাবে তিনি সংবিধানে সমাজতন্ত্র কথাটা ব্যবহার করেছেন; কিন্তু তাঁর সমাজতন্ত্র রাশিয়ার আদলের সমাজতন্ত্র ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে সমাজতন্ত্র

১৯৬৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর দলের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু তাঁর সমাজতন্ত্র বামপন্থীদের সমাজতন্ত্র ছিল না। সেই সমাজতন্ত্রে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছিল না। ছিল ধর্মীয় প্রেরণা। তাঁর দৃষ্টিতে ধর্ম এ দেশের দেশজ সম্পদ। দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে শেখ মুজিব বলেন, ‘এই সমাজতন্ত্র আমরা রাশিয়া বা চীন হইতে আমদানী করিব না। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের নিজস্ব প্রয়োজন মত দেশজ সম্পদের ভিত্তিতেই উহা গড়িয়া তুলিবেন। এই দেশজ সম্পদ বলিতে আমার দল দেশের পারিপার্শ্বিকতা, ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি, জীবনের প্রতি মনোভাব, জাতীয় সম্পদ ও দেশের মানুষের প্রতিভাকে বুঝায়।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বলেন, ‘তিনি বাম বা দক্ষিণপন্থী কোনোটাই নহেন। তিনি হইতেছেন মধ্যমপন্থী।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯)

কাজেই বোঝা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা-সমাজতন্ত্র বাম ও অতিপ্রগতিবাদীদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র থেকে আলাদা ছিল।

বামদের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশ করেছে। বঙ্গবন্ধু বইটির মূল নাম দিয়েছিলেন  ‘থালা বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’। এটি একনাগাড়ে পড়ার মতো একটি বই-ই নয়, একজন মহামানবের একটি অসাধারণ মানবিক দলিলও বটে।

রোজনামচার শুরু ২ জুন, ১৯৬৬ সালে। দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে শেখ মুজিব (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হননি) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৭ জুন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছয় দফার দাবিতে সারা দেশে হরতাল ডাকা হয়েছে। এই হরতাল সামনে রেখে মোনেম খাঁর সরকার চারদিকে ধরপাকড় শুরু করেছে। বাদ যাচ্ছে না সাধারণ দিনমজুরও। ঢাকা থেকে প্রকাশিত মুসলিম লীগঘেঁষা দৈনিক মর্নিং নিউজে ভাসানী ন্যাপের নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ছয় দফা কর্মসূচি কার্যকর হইলে, পরিশেষে উহা সমস্ত দেশে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব জাগাইয়া তুলিবে। এমনকি তিনি (যাদু) যদি প্রেসিডেন্ট হতেন তাহলে ছয় দফা বাস্তবায়িত হতে দিতেন না।’ শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘এদের এই ধরনের কাজেই তথাকথিত প্রগতিবাদীরা ধরা পড়ে গেছে জনগণের কাছে।’ যাদু মিয়া ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহের ঠিকাদারির কাজ করতেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জেনারেল জিয়া যাদু মিয়াকে উপপ্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। যাদু মিয়াদের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শেখ মুজিব আরো লিখেছেন, ‘এরা নিজেদের চীনপন্থীও বলে থাকেন। একজন এক দেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী হয়? আবার জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিৎকার করে?...এর আগে মওলানা ভাসানী সাহেবও ছয় দফার বিরুদ্ধে বলেছেন, কারণ দুই পাকিস্তান নাকি আলাদা হয়ে যাবে।...মওলানা সাহেব পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে এক কথা বলেন, আর পূর্ব বাংলায় এসে অন্য কথা বলেন। যে লোকের যে মতবাদ সেই লোকের কাছে সেভাবেই কথা বলেন।’ শত বাধা উপেক্ষা করে সেদিন দেশের বিভিন্ন শহরে হরতাল পালিত হয়েছিল। মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালালে সরকারের প্রেসনোট অনুযায়ী ১০ জন নিহত হয়েছিল। পরে হাসপাতালে একজন মারা যান। প্রথম দিকে এত মানুষের প্রাণহানির খবর শুনে শেখ মুজিব বেশ বিচলিত বোধ করলেও তিনি লিখেছেন, ‘মনে শক্তি ফিরে এলো এবং আমি দিব্যচোখে দেখতে পেলাম জয় আমাদের অবধারিত।’

বঙ্গবন্ধু অতিপ্রগতিবাদীদের পছন্দ করতেন না। তিনি লিখেছেন, ‘অতি প্রগতিবাদীদের কথা আলাদা। তারা মুখে চায় ঐক্য। কিন্তু দেশের জাতীয় নেতাদের জনগণের সামনে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে, চেষ্টা করে সে জন্য। তাহলেই ভবিষ্যতে জনগণকে বলতে পারে যে, এ নেতাদের ও তাদের দলগুলি দ্বারা কোনো কাজই হবে না। এরা ঘোলা পানিতে মাছ ধরবার চেষ্টা করতে চায়।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২৪৫)

ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনমনের বিভ্রান্তি দূর করা আওয়ামী লীগের কাছে ইতিহাসের দাবি। যত দিন ধর্মনিরপেক্ষতার যথার্থ ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, পাশাপাশি অপব্যাখ্যা রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তত দিন অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন সুদূরপরাহত।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য