kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

নারী ও শিশুদের নিয়ে পরিবারের রমজান

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



নারী ও শিশুদের নিয়ে পরিবারের রমজান

মায়েদের একান্ত বিধি-বিধান

অভিজ্ঞ ডাক্তার যদি অন্তঃসত্ত্বা নারীকে রোজা পালনে নিষেধ করে থাকেন, তাহলে ওই নারীর জন্য রোজা না রাখার অবকাশ আছে। সন্তান প্রসবের পর সুস্থতা লাভ করলে এই রোজা কাজা করে নিতে হবে। এর জন্য কাফফারা আদায় করতে হবে না।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, রোজা অবস্থায় শিশুকে দুধ পান করালে রোজা ভঙ্গ হবে কি না? রোজা অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধ পান করালে রোজা ভঙ্গ হয় না। (ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৬/৪০৮)

যে মায়েরা বাচ্চাদের দুধ খাওয়ান, যদি অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে রোজা রাখার কারণে মা অথবা বাচ্চা কারো ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সেই রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে পারবে। তবে পরবর্তী সময় ওই রোজাগুলো কাজা করে নিতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম : ৬/২৮৯)

নেফাজওয়ালা (সন্তান প্রসবকারী) নারী যদি ৪০ দিন হওয়ার আগেই পবিত্র হয়ে যায়, তাহলে রোজা রাখবে। তবে নামাজের জন্য গোসল করে নেবে। আর যদি ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও রক্ত চলমান থাকে, তাহলে সে রোজা রাখবে ও গোসল করে নেবে। কেননা তার রক্ত ইস্তেহাজা (রোগ) হিসেবে গণ্য করা হবে। (বেহেশতি জেওর, পৃষ্ঠা ১৬০; শরহে বেকায়া, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ১২০)

অনেক মায়ের সিজারের প্রভাবে খালি পেটে থাকলেই পেটে ব্যথা হয়। ফলে তারা রোজা রাখতে পারে না। সে ক্ষেত্রে তারা প্রতি রমজান শুরু হলেই রোজার ফিদইয়া দিয়ে দিতে পারে। তবে কখনো সুস্থতা ফিরে এলে অবশ্যই সব রোজার কাজা করতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ৫/৪৫৬)

 

নারীদের বিশেষ কিছু মাসায়েল

কোনো নারীর যদি ফজরের আগেই ঋতুস্রাব শুরু হয়ে যায়, ওই নারীর জন্য দিনের বেলা খাওয়াদাওয়া করা বৈধ। তবে গোপনে পানাহার করা উচিত। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৪২৮)

রোজা রাখার পর দিনের বেলা ঋতুস্রাব শুরু হলে নারীর রোজা ভেঙে যায়। তাই কোনো নারীর এমনটি হলে তার জন্য খাওয়াদাওয়া করা বৈধ। তবে ওই দিন রোজাদারদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে পানাহার থেকে বিরত থাকা উত্তম। (ফাতাওয়া হক্কানিয়া : ৪/১৯০)

কেউ ঋতুস্রাবের কারণে রোজা না রেখে দিন শুরু করেছেন, কিন্তু দিনের বেলায় ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে দিনের বাকি অংশ রোজাদারদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে পানাহার বর্জন করতে হবে। এবং এই দিনের রোজাও কাজা করতে হবে। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৪২৮), বাহুরুর রায়েক : ২/২৯১)

নারী যদি নিজের অভ্যাস অনুযায়ী বুঝতে পারে যে আগামীকাল তার মাসিক শুরু হবে, তবু সে রোজা ভাঙবে না, যতক্ষণ না সে তার ঋতুস্রাবের রক্ত দেখতে পায়। (আপকে মাসায়েল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা ২৭৮)

ঋতুবতী নারীর জন্য উত্তম হলো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা এবং আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। ওষুধ ব্যবহার করে রক্ত বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। কেননা ইসলামের মহীয়সী সব নারী এমনটাই করেছেন। তবে যদি ওষুধ দিয়ে রক্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে রোজা রাখা যাবে এবং রোজা হয়ে যাবে। (আপকে মাসায়েল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা ২০৭)

অনেক নারী রোজা পালনের সুবিধার্থে ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখে। এতে যদি শারীরিক ক্ষতি না হয়, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।

নারীদের অপবিত্র থাকার সময় নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কোরআন তিলাওয়াত ও মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ, যেভাবে তা অপবিত্র পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা বিভিন্ন দোয়া-দরুদ, তাসবিহ-তাহলিল ও জিকির-আজকার করতে পারবেন। এমনকি দোয়া হিসেবে আয়াতুল কুরসি ও কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পাঠ করা যাবে। এতে সওয়াব পাওয়া যাবে, নিরাপত্তাও লাভ হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক কারণে আমাদের দেশের নারীরা রমজানে কঠোর পরিশ্রম করে থাকেন। বিশেষত সাহির ও ইফতারের প্রস্তুতির ভার তাদেরই বহন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পুরুষের উচিত নারীদের যথাসম্ভব সহায়তা করা। কেননা পরিবার নারী-পুরুষ সবার। নারীরাও রক্তমাংসের মানুষ। তারাও রোজা রাখে। কাজেই তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। মহানবী (সা.) গৃহস্থালি কাজে তাঁর স্ত্রীদের সাহায্য করতেন। তাঁর জীবন ঈমানদারদের জন্য উত্তম আদর্শ।

রান্না করার সময় নাক-মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃত ধোঁয়া প্রবেশ করলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে ইচ্ছাকৃত প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যাবে। (হেদায়া : ১/১০৮)

 

নারীরা কিভাবে তারাবির নামাজ আদায় করবে

পুরুষদের মতো নারীদের জন্যও তারাবি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। নারীরা ঘরে একা নামাজ পড়লে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। তাই তাদের মসজিদে না গিয়ে ঘরেই তারাবি আদায় করে নেওয়া উত্তম। ঘরে নারীরা মিলে জামাত করার প্রয়োজন নেই।

রমজান মাসের জন্য ঘরে হাফেজ রেখে নারীদের পুরুষ ইমামের পেছনে জামাত করার প্রতিও উৎসাহিত করা হয়নি। তবে তারা যদি পুরুষ ইমামের পেছনে নামাজ পড়ে, তাহলে ওই নামাজ শুদ্ধ হবে। তবে এ ক্ষেত্রে নারীদের পর্দার বিধান যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। (তাবঈনুল হাকায়েক : ১/১৩৫, ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৩/৪৩)

কোনো পুরুষ শরিয়ত অনুমোদিত কোনো কারণে মসজিদে যেতে পারেননি, পরে তিনি ঘরের মাহরাম নারীদের নিয়ে জামাতে তারাবি পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে সবাই জামাতের সাওয়াব পাবেন। কিন্তু গায়রে মাহরাম নারীদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়া সমীচীন নয়। তা সত্ত্বেও মাহরাম নারীদের পাশাপাশি গায়রে মাহরাম নারীরা তাতে শরিক হতে চাইলে অবশ্যই পর্দার আড়ালে থাকবে। পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে জামাত করা বৈধ নয়। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/২২৮, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল : ২/২২৭)

 

রান্নাঘরে প্রয়োজনাতিরিক্ত সময় ব্যয় করা থেকে বিরত থাকা

রমজানে আমাদের মা-বোনরা রকমারি ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। ইফতার যেহেতু ইবাদত, তাই ইফতার যত্নসহকারে বানানোও ইবাদত। তবে শুধু হরেক রকম ইফতার তৈরি করতে গিয়ে যেন ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে...।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৬৬২৬)

তাই এ মাসের একটি মুহূর্ত হেলায় কাটানোর সুযোগ নেই। ইফতারের  সময় তো আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু তখন মহান আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না। ইফতারের সময় রোজাদার ব্যক্তির দোয়া, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া ও মজলুমের দোয়া।’ (তিরমিজি)

তাই এ সময় রান্নাঘরে না থেকে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, তাওবার মাধ্যমে কাটানোর চেষ্টা করাই নারীদের দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপ ক্ষমা করাতে পারেনি, তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক।’ (জামেউল উসুল, হাদিস : ১৪১০)

 

অহেতুক কথা ও কাজে সময় ব্যয় না করা

রমজানে নিজেদের আলাপচারিতার ফাঁকে কারো দোষচর্চায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। দোষচর্চা নিকৃষ্টতম অভ্যাস। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পেছনে ও সামনে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ—ধ্বংস।’ (সুরা হুমাজাহ, আয়াত : ১)

রোজা রেখে অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ানোও অনুচিত। এতে রোজার মহিমা ক্ষুণ্ন হয়। পবিত্র কোরআনে মানুষের দোষত্রুটি অন্বেষণকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা একে অন্যের দোষত্রুটি অন্বেষণ কোরো না এবং পরস্পর গিবত কোরো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা ঘৃণাই করে থাকো। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)

তাই পবিত্র রমজানে অহেতুক গল্পের আসরে না বসাই ভালো।

কোনো কোনো নারীর মধ্যে টিভি সিরিয়াল আসক্তি বেশি কাজ করে। তারা অবসরে টিভি সিরিয়ালে ডুবে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এর প্রভাব পড়ে তাদের শিশুদের ওপরও। এটি রোজার জন্য যেমন ক্ষতিকারক, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও এর খারাপ প্রভাব পড়ে।

 

রমজানে প্রতিবেশীর খোঁজখবর

ইসলামে প্রতিবেশীর হককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে আমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেশীকে মিরাসের অংশীদার বানিয়ে দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ৬০১৪)

রমজানের সাহির-ইফতারেও প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। প্রতিবেশী সাহিরর সময় ঠিকমতো জাগতে পারল কি না, তার ঘরে সাহির-ইফতারের ব্যবস্থা আছে কি না, এসব বিষয়ে সাধারণত নারীরা বেশ সচেতন থাকেন। এটা সব মুমিনেরই দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস : ২৬৯৯; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১২)

তাই নারীরা চাইলে সহজেই তাঁদের অসচ্ছল প্রতিবেশীদের জন্য ইফতারের কিছু অংশ পাঠিয়ে দিতে পারেন। এতে প্রতিবেশীর হক আদায়ের সওয়াব যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াবও পাওয়া যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। কিন্তু এর কারণে রোজাদারের সওয়াবের থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না। (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

 

শিশুদের কিভাবে রোজার প্রশিক্ষণ দেবেন

প্রত্যেক মা-বাবার দায়িত্ব হলো, সন্তানকে পর্যাপ্ত ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া। পাশাপাশি আমল ও ইবাদতের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে তোলা। সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে নামাজ-রোজায় অভ্যস্ত করাতেন, যেন তারা এই মহান ইবাদত পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সন্তানকে উত্তম গুণাবলি ও ভালো কাজে অভ্যস্ত বানানোর জন্য মহানবী (সা.) বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। নামাজ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজ আদায়ের আদেশ করো। এ ব্যাপারে অবহেলা করলে ১০ বছর বয়সে তাদের প্রহার করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

শিশুদের রোজার অভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে : রুবাই বিনতে মুআব্বিজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আশুরার সকালে আল্লাহর রাসুল (সা.) আনসারদের সব পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি সাওম পালন করেনি, সে যেন দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকে; আর যার সাওম অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন সাওম পূর্ণ করে। তিনি (রুবাই) (রা.) বলেন, পরবর্তী সময় আমরা ওই দিন সাওম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের সাওম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ওই খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত। (বুখারি, হাদিস : ১৯৬০; মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১১৩৬)

ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারি শরিফে একটি অনুচ্ছেদের নামকরণ করেছেন ‘সাওমুস সিবয়ান’ বা শিশুদের রোজা। এ অনুচ্ছেদের অধীনে তিনি হজরত ওমর (রা.)-এর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ওমর (রা.) রমজান মাসে এক নেশাগ্রস্ত লোককে বলেছিলেন, ‘তোমার জন্য আফসোস! আমাদের ছোট শিশুরা পর্যন্ত রোজাদার! (অথচ তুমি রোজা রাখো না)।’ এরপর ওমর (রা.) তাকে প্রহার করেন। এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) লিখেছেন, ইবনে সিরিন, ইমাম জুহুরি ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.)সহ পূর্ববর্তী বহু মনীষী শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করানোকে মুস্তাহাব ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে, নামাজের মতো সাত থেকে ১০ বছরের শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করানো যায়। (ফাতহুল বারি : ৫/৩)

আলেমদের কেউ কেউ এ সময়কে ১০ বছর বয়স থেকে নির্ধারণ করেছেন। সময় ভেঙে ভেঙেও শিশুদের রোজা রাখানো যায়। যেমন—প্রথমে কিছুদিন ঠিক দুপুরে পানাহার, পরে মাগরিবের সময় ইফতার। এভাবে শিশুরা রোজা পালনে অভ্যস্ত হয়। মনে রাখতে হবে, রোজা রেখে কোনো শিশু যদি একেবারে কাতর বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে দেরি না করে তার রোজা ভেঙে ফেলাও বৈধ। কেননা মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘...তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)

 

অধীনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা

রমজানের কিছু কিছু সময় ঘরে কাজের চাপ বেশি থাকে। তাই রমজানের দিনে অধীনদের সহযোগিতা করা যেতে পারে। এমন কোনো কাজ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে অধীনদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, তারা তো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা ওদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যার ভাইকে তার অধীন করে দেন, সে নিজে যা খায়, তাকেও যেন তা খাওয়ায়। সে নিজে যা পরে, তাকেও যেন তা পরায়। আর তার ওপর যেন এমন কোনো কাজ না চাপায়, যা তার শক্তির বাইরে। আর যদি তার ওপর এমন কঠিন ভার দিতেই হয়, তাহলে সে নিজেও যেন তাকে সাহায্য করে। (বুখারি, হাদিস : ৬০৫০)

তাই এ মাসে তাদের কাজের চাপ কমিয়ে দিয়ে তাদের খাওয়াদাওয়ার খোঁজখবরও রাখা উচিত।

তারা কোনো অপরাধ করে ফেললে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! শ্রমিককে কতবার ক্ষমা করব? নবীজি চুপ থাকেন। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) বলেন, প্রতিদিন ৭০ বার হলেও তার অপরাধ ক্ষমা করবে।’ (আবু দাউদ : ২/৭৬৩)

হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদিনায় আমি ১০ বছর যাবৎ রাসুল (সা.)-এর খিদমত করেছি। তখন আমি বালক ছিলাম। সব কাজ আমার মালিক যেভাবে করাতে চেয়েছেন সেভাবে করতে পারিনি। সে জন্য তিনি আমার প্রতি কখনো মনঃক্ষুণ্ন ভাব প্রকাশ করেননি এবং কখনো আমাকে বলেননি, তুমি এটা কেন করলে অথবা এটা কেন করলে না? (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৭৪)

 

স্বামী-স্ত্রী মিলে তারাবি

কোনো যৌক্তিক কারণে স্বামী যদি মসজিদে যেতে না পারে, তাহলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করতে পারবে। তবে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সংলগ্ন না দাঁড়িয়ে পেছনের সারিতে একা দাঁড়াবে। অপারগতায় ডান পাশে একটু পেছনে সরে দাঁড়ালেও নামাজ হয়ে যাবে। তবে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সমান হয়ে দাঁড়াবে না। কারণ এতে উভয়ের নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার : ১/৫৭২)

 

গৃহস্থালি কাজে নারীদের সহযোগিতা

রমজানকে কেন্দ্র করে নারীদের ওপর যেন বাড়তি চাপ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা পুরুষদেরই দায়িত্ব। তাই গৃহস্থালি কাজে নারীদের সহযোগিতা করা উচিত। শুধু রমজান কেন, সারা বছরই সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতা করা পুরুষের কর্তব্য। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও এমনটি করেছেন। তিনি অবসর সময়ে পরিবারবর্গকে পারিবারিক কাজে সহায়তা করতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন। হজরত আসওয়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম যে রাসুল (সা.) ঘরের মধ্যে কী কাজ করতেন? উত্তরে তিনি বলেন, তিনি ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, অর্থাৎ গৃহস্থালি কাজে পরিবার-পরিজনের সহযোগিতায় থাকতেন। যখন নামাজের সময় হতো, নামাজে চলে যেতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)

তাই প্রিয় নবীর সুন্নত অনুসরণের উদ্দেশ্যে হলেও গৃহস্থালি কাজে সাধ্যমতো নারীদের সহযোগিতা করা উচিত। তা ছাড়া এর মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনও আরো দৃঢ় হবে। ভালোবাসার ফুলগুলো সৌরভ ছড়াবে প্রতিটি মুহূর্তে। তাই কোনো কাজকেই ছোট মনে না করে সাধ্যমতো সব কাজে হাত লাগানো যেতে পারে।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি (রাসুল) স্বীয় কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন এবং সাধারণ মানুষের মতোই ঘরের কাজকর্ম করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪৯০৩)

মন্তব্য