kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

সমন্বিত পরিকল্পনায় অর্থনীতির বাঁক বদলাবে পদ্মা সেতু

মাসুদ রুমী   

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমন্বিত পরিকল্পনায় অর্থনীতির বাঁক বদলাবে পদ্মা সেতু

দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হলো অর্থনীতির নতুন দুয়ার। এই সেতু চালুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ খুবই সহজ হয়ে গেল। এর মধ্যে দিয়ে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় নতুন ভূমিকা রাখবে দক্ষিণাঞ্চল। এই সেতু রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামাল সরবরাহ এবং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।

বিজ্ঞাপন

তাই এই সেতু অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। পদ্মা সেতুর কারণে জিডিপিতে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি ডলার যোগ হবে, যা সেতুটির ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ বেশি। তবে তাঁরা বলছেন, এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ সহায়ক নীতি প্রয়োজন। তাহলে দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর অবদান প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হবে।   

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে, যেন বিদেশি বিনিয়োগ আসে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, জিডিপিতে এর অবদান তত বেশি হবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড খুবই কম। পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে তা ধীরে ধীরে বাড়বে। কিছু নীতি কাঠামো সংস্কার হলে বিনিয়োগ আরো বাড়বে। পদ্মা সেতুতে যেমন টোল দিতে হবে, তেমনি সেতু পার হয়েও ব্যবসা করতে গেলে যাতে অদৃশ্য টোল দিতে না হয় তা দেখতে হবে। এগুলো ঠিক থাকলে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু। ’

সুফল পেতে যা করতে হবে

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ সুবিধা পেতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত নীতি সংস্কার জোরদার করতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার যে দ্বার উন্মোচিত হলো সেই দ্বার দিয়ে সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলকে কেন্দ্র করে আরো কিছু নীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতি কাঠামোর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলটিকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। চীনের শেনজেন কিংবা জর্দানের আকাবার আদলে পুরো অঞ্চলকে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য ছোট ছোট আরো কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে আমরা সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছি। এখন আমাদের আরো একটি পদ্মা সেতুসহ সাত-আটটি বড় সেতু হলে সারা দেশের সড়কব্যবস্থা একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে চলে আসবে এবং যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে আমাদের পরিবহন ব্যয় কমবে, বাড়বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ’

জিডিপি যেভাবে বাড়বে

পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে ২১ জেলায় গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্প। পায়রা বন্দরের সঙ্গে মোংলা বন্দর, ঢাকা ও সারা দেশের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরো সহজ হবে। খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট অঞ্চলের হিমায়িত মাছ রপ্তানি আরো সহজ করে তুলবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আঞ্চলিকসহ দেশের অর্থনীতিতে।   পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে বিভিন্ন সংস্থা পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এডিবির সমীক্ষায় দেখা যায়, পদ্মা সেতু দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন, যা প্রতিবছরই বাড়বে। সেতুটি দেশের জিডিপির হার বাড়াবে ১.২৩ শতাংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়াবে ২.৩ শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাড়াবে ০.৮৪ শতাংশ।

আঞ্চলিক যোগাযোগ

সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর উন্নতি হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়বে। সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা প্রতিবছর ৭-৮ শতাংশ বাড়বে, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ৬৭ হাজারে দাঁড়াবে।

শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণ

পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। একসময় ওই সব এলাকার জমির দাম অনেক কম থাকলেও সেতু হওয়ায় এখন দাম বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে জানান ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন।

পর্যটন

পদ্মা সেতু ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার, মাওয়া ও জাজিরায় পুরনো-নতুন রিসোর্টসহ নতুন-পুরনো পর্যটনকেন্দ্রগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।



সাতদিনের সেরা