kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

২০ লাখ বস্তা আলু হিমাগারে ♦ প্রতি বস্তায় লোকসান ৪০০ টাকা

দুশ্চিন্তায় কৃষক ব্যবসায়ী

আলমগীর চৌধুরী, জয়পুরহাট   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুশ্চিন্তায় কৃষক ব্যবসায়ী

হিমাগার থেকে শেডে ফেলে আলু বাছাই করা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাজার দিন দিন নিম্নমুখী হওয়ায় জয়পুরহাটের কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের দিন কাটছে এখন দুশ্চিন্তায়। প্রকারভেদে প্রতি বস্তা (৬০ কেজি) হিমায়িত আলু বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অথচ হিমাগারে মজুদের সময় এসব আলুর বস্তাপ্রতি খরচ পড়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। এতে প্রতি বস্তা আলুতে লোকসান হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বিক্রি মৌসুম শেষ হতে মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও জেলার ১৭টি হিমাগারে এখনো আলুর মজুদ রয়েছে প্রায় ২০ লাখ বস্তা। আলুর এই মন্দাবস্থা কাটাতে সরকারি উদ্যোগে বিদেশে রপ্তানি ছাড়াও টিসিবি অথবা টিআর, কাবিখা প্রকল্পে আলু সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন কোল্ড স্টোর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। এই দাবিতে সম্প্রতি তাঁরা বগুড়ার জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। বাজারের এ মন্দাবস্থা আসন্ন মৌসুমে আলু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। 

জয়পুরহাট জেলায় গত মৌসুমে ৪০ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমি থেকে আলু উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন। গত বছর হিমায়িত আলুর আশাতীত মুনাফা পেয়ে এবার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জেলার ১৭টি হিমাগারে আলু মজুদ করেন প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার টন। ৬০ কেজি হিসাবে যার পরিমাণ ২৬ লাখ বস্তা। এবার অ্যাস্টেরিক জাতের ৬০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে খরচ পড়েছে এক হাজার টাকা, আর দেশি জাতের লাল গুঁটি আলুতে খরচ পড়েছে এক হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে অ্যাস্টেরিক জাতের প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। আর দেশি গুঁটি আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আলুর মজুদ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন হিমাগার মালিকরা। কোনো কোনো হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুর বিপরীতে ঋণও দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া আর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী আলু নিতে কালক্ষেপণ করছেন। ফলে জেলার প্রতিটি হিমাগারে সংরক্ষণের অর্ধেকেরও বেশি আলু মজুদ রয়েছে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যেই হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু লোকসানের কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন করছেন না। ফলে বিশাল মজুদ নিয়ে আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন হিমাগার মালিকরা।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত বছর আলুর দাম বেশি হওয়ায় সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এবার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু নিয়ে বিপাকে পড়লেও সরকারের কোনো নজরদারি নেই। তাঁরা দাবি করেন, বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি টিসিবি থেকে শুরু করে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগে আলু সরবরাহ করা গেলে আলু নিয়ে তাঁদের এ দুরবস্থার নিরসন ঘটবে।

জেলার কালাই উপজেলার মোলামগাড়ী বাজারের আলু ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘গত বছর কেজিপ্রতি ১৭ টাকা দরের আলু সরকার ২৩ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। অথচ দাম উঠেছিল ৩৫ টাকা। কিন্তু এবার ১৮ টাকা দরের আলু যে বিক্রি হচ্ছে আট থেকে ৯ টাকায়। সরকার এখন নজর দিচ্ছে না কেন?’ ক্ষেতলাল উপজেলার বেলগাড়ী গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, ‘আসন্ন মৌসুমে রোপণের জন্য তিনি ১০০ বস্তা অ্যাস্টেরিক জাতের আলু স্থানীয় মোল্লা হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন। ৬০ কেজির প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে তাঁর খরচ হয়েছে এক হাজার ২০ টাকা। এখন সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকায়। বিশাল এ লোকসান কাটিয়ে আসন্ন মৌসুমে কিভাবে আলু রোপণের খরচ জোগাবেন সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। দাম কমে যাওয়ায় আলু নিয়ে এমন ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা জেলার বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ও কৃষকের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালাই উপজেলার নর্থপোল কোল্ড স্টোরেজে এ বছর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু সংরক্ষণ করেছেন এক লাখ ৭০ হাজার বস্তা। যার মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উত্তোলন করেছেন ৫৯ হাজার বস্তা। ক্ষেতলালের হাফিজার রহমান বীজ হিমাগারে কৃষকরা এ বছর আলু সংরক্ষণ করেছেন এক লাখ ২০ হাজার বস্তা। এ পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ৭০ হাজার বস্তা। একইভাবে কাথাইল গোপীনাথপুর পল্লী হিমাগারে এক লাখ ১৮ হাজার বস্তা সংরক্ষণ হলেও এ পর্যন্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উত্তোলন করেছেন মাত্র ৩৫ হাজার বস্তা। 

মোলামগাড়ী নর্থপোল কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আলুর দাম না থাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু নিতে আসছেন না। ফলে এবার সংরক্ষণের অর্ধেকেরও বেশি আলু হিমাগারে মজুদ রয়েছে।’ ক্ষেতলালের হাফিজার রহমান বীজ হিমাগারের মালিক আশরাফ আলী বলেন, ‘আমার হিমাগারে সংরক্ষণ করা এক লাখ ২০ হাজার বস্তা আলুর মধ্যে ৭০ হাজার বস্তা কৃষকরা উত্তোলন করেছেন। বাকি ৫০ হাজার বস্তা এখনো মজুদ আছে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করা না গেলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবলু কুমার সূত্রধর বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম কম হলেও আসন্ন মৌসুমে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আলু আর ধান, জয়পুরহাটের প্রাণ। লোকসান হলেও জয়পুরহাটের কৃষকরা আলু আর ধান রোপণ থেকে কখনো বিমুখ হবেন না। এ জেলার অতীত রেকর্ড তাই বলে।’



সাতদিনের সেরা