kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জোর প্রচেষ্টা

এনবিআরের নজরে বড় করদাতা

♦ মোবাইল কম্পানি, ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন কম্পানি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিগারেট, সিরামিক, পরিবহন খাত থেকে আদায়ে জোর দিয়েছে
♦ ভ্যাট আদায়ে অডিট ও অভিযান বাড়ানো হয়েছে
♦ আমদানি-রপ্তানি থেকে সঠিক হিসাবে রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থান

ফারজানা লাবনী   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এনবিআরের নজরে বড় করদাতা

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায়ে ঘাটতি পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাসের চূড়ান্ত হিসাবেও ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় মাপের করদাতা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছে এনবিআর। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত আদায়ের পাশাপাশি বকেয়া আদায়ে জোর বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষভাবে মোবাইল কম্পানি, ওষুধ, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন কম্পানি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিগারেট, সিরামিক, পরিবহন খাত থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আমদানি-রপ্তানি থেকে সঠিক হিসাবে রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এনবিআর।

চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ৫৩ শতাংশ জোগাড়ে এনবিআরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। করোনার আগে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে এনবিআর আয় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। কিন্তু গত বছরের মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর রাজস্ব আদায়ে আগের সব হিসাব পাল্টে যায়। আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ধারা চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত আছে।   

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে সরকারের নিয়মিত খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নেও অর্থের প্রয়োজন। এনবিআর আয় করতে না পারলে সরকারের নিয়মিত খরচ চালানো ও বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে।’

এনবিআর সদস্য (করনীতি) আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার মধ্যেও এনবিআর কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে রাজস্ব আদায় করছেন। করোনার কারণে বেশির ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। এতে অর্থবছরের শুরুতে আদায় কিছুটা কম হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেশি হয়েছে।’ চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আদায় হয়েছে ১৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কম।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই পাঁচ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে। গত বছর একই সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে পাঁচ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় বাড়লেও এবারে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। চলতি অর্থবছরে ভ্যাটের আবগারি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক আদায়ও কমেছে।

ভ্যাট খাতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অডিট ও অভিযান বাড়িয়েছে। তারা দুভাবে কাজ করছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বার্ষিক অডিট কর্মসূচি তৈরি করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন ও অডিট করছে এবং ভ্যাট আইনের ধারা ৮৩ অনুসারে তল্লাশি ও অভিযান পরিচালনা করছে। এ ছাড়া অভিযান ও তদন্তকালে আরো পাঁচ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটনে কাজ করছে। ভ্যাট গোয়েন্দারা অভিযানে বা তদন্তকালে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েছে কি না, উপকরণ কেনা ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রির তথ্য মাসিক রিটার্নে সঠিকভাবে প্রদর্শন করেছে কি না বা প্রতিষ্ঠানটির একাধিক বার্ষিক সিএ রিপোর্ট আছে কি না। অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রির ওপর ভ্যাট দিলেও ব্যয়ের ওপর উৎস প্রযোজ্য ভ্যাট কর্তন করে না। এভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকে। এ বিষয়টিও ভ্যাট গোয়েন্দারা অভিযানে বা তদন্তকালে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। অভিযানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ভ্যাট গোয়েন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধন নম্বর দিয়ে নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।   

চলতি অর্থবছরে প্রথম মাসে আয়কর ও ভ্রমণ কর আদায় হয়েছে চার হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। গত বছর এ খাতে আদায় হয়েছে চার হাজার ১১৮ কোটি টাকা। চলতিবারে ২০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ভ্রমণ কর আদায় হয়েছে। গত অর্থবছর একই সময়ে এ খাতে আদায় হয়েছে দুই কোটি ৩৩ লাখ টাকা। করোনার কারণে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। অনেক ছোট ও মাঝাারি ব্যবসায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠানের জনবলের বেতন কমিয়ে দিয়েছে। সাধারণ আয়ের করদাতাদের কাছে এনবিআর কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায়ে গেলেও পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক করদাতার কাছে বড় অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। মূলত করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে সামগ্রিকভাবে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক ধারা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় মাপের করদাতাদের কাছ থেকে আদায়ে জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে বড় অঙ্কের বকেয়া পাওনা আছে এমন করদাতাদের কাছ থেকে আদায়ে এনবিআর কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম (জুলাই) মাসে শুল্ক খাতে আদায় হয়েছে চার হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে শুল্ক খাতে পাঁচ হাজার ১৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। দেশে করোনাব্যাধির সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় শুল্ক খাতে আয় কমেছে। শুল্ক খাতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধে এনবিআর কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় অঙ্কের ঘাটতির মুখে গত অর্থবছরের জানুয়ারিতে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ এক হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ২৯ হাজার কোটি টাকা কমানো হলেও গত অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৭৩ হাজার কোটি টাকা। 

গত অর্থবছরে আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা ৯৭ হাজার কোটি টাকার রিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা।



সাতদিনের সেরা