kalerkantho

সোমবার । ২ কার্তিক ১৪২৮। ১৮ অক্টোবর ২০২১। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জটে বেসামাল চট্টগ্রাম বন্দর

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জটে বেসামাল চট্টগ্রাম বন্দর

ঈদের ছুটি এবং কভিড ‘শাটডাউন’ শুরু হতে না হতেই চট্টগ্রাম বন্দর বড় ধরনের কনটেইনারজটে পড়েছে। জট এড়াতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে নামিয়ে পণ্যভর্তি কনটেইনার সরাসরি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে খালাসের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে সেই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডের বদলে বেসরকারি ডিপোতে কনটেইনার সরিয়ে কত দিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, পরিস্থিতি উত্তরণে এটা কোনো সঠিক সমাধান নয়। এটা মূলত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনারজট ডিপোতে স্থানান্তর করা হয়েছে। পণ্য ডেলিভারি না নিলে কনটেইনার ডিপোতেও জট লেগে যাবে। এভাবে টেনেটুনে পরিস্থিতি সাময়িক সামাল দেওয়া যাবে; কিন্তু শিল্প-কারখানা চালুর আগ পর্যন্ত এর সঠিক সমাধান হবে না।

গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘বন্দরের ভেতর কনটেইনারজট কমাতে এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এটা ঠিক; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমদানি কনটেইনার বন্দরের বদলে ডিপোতে নিতে হবে। সেখান থেকে ডেলিভারি নিতে হলেও শিল্প-কারখানা খোলা রাখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কারখানা খুলবে না, তত দিন গার্মেন্টশিল্পের জন্য আনা কাঁচামাল কোথায় নিয়ে রাখব?’

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই বেসরকারি ডিপো থেকে কনটেইনার ছাড় নেওয়া ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তার ওপর কারখানা বন্ধ থাকায় আমদানি পণ্য ডিপোতেই জমে থাকবে। শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে ডিপো পূর্ণ হয়ে বন্দরেও জট লেগে যাবে। এ জন্য আমরা পুনরায় সীমিত পরিসরে হলেও কারখানা খোলার দাবি জানাচ্ছি।’

শিল্প-কারখানার কাঁচামাল ছাড়াও বন্দর থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফলভর্তি কনটেইনারও জমে গেছে বিপুল পরিমাণ। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমদানি পণ্যভর্তি সব ধরনের কনটেইনার ডিপোতে নেওয়ার পদক্ষেপ নিলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনটেইনার ডিপোতে নেওয়ার অনুমোদন দেয়নি। ফলে এসব কনটেইনারও জমেছে বন্দর ইয়ার্ডে।

ফল আমদানিকারক জিএস ট্রেডিংয়ের কর্ণধার নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বন্দর থেকে স্বাভাবিক সময়ে ৭০ থেকে ৮০ কনটেইনার বিভিন্ন ধরনের আমদানি ফল ডেলিভারি হয়; কিন্তু এখন সেটি আট থেকে ১২ কনটেইনারে নেমেছে। মূলত লকডাউনে বেচাকেনা না থাকায় কনটেইনার বন্দর থেকে ছাড় করছি না। বন্দরে রেখে দেওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতিতে আছি আমরা।’

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ২৩ জুলাই থেকে আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের শিল্প-কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এই ১৪ দিনে জাহাজ থেকে নামানো সব কনটেইনার বেসরকারি ডিপোতে রাখা যাবে? জবাবে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা সচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘এটি এখনই বলা কঠিন। কারণ আমাদের ডিপোতে এখন ১২ হাজার একক রপ্তানি কনটেইনারের জট লেগে আছে। স্বাভাবিক সময়ে সেটি থাকে ছয় থেকে সাত হাজার একক কনটেইনার। এই রপ্তানি কনটেইনার না থাকলে আমরা একসঙ্গেই ১০ থেকে ১২ হাজার একক আমদানি কনটেইনার বন্দর থেকে ডিপোতে নিয়ে আসতে পারতাম। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব না। এর পরও আমি বলব, বন্দরের এই সিদ্ধান্ত বন্দরের ভেতর জট কমাতে সহায়তা করবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারখানা না খুললে কত দিন এভাবে চালানো যাবে, তা কয়েক দিন যাওয়ার পর বোঝা যাবে।’

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, পণ্য আমদানি ও রপ্তানির সঙ্গে শিল্প-কারখানা খোলা রাখা এবং বন্দর সচল থাকা পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারিতে যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তেমনি রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারখানা খোলা রাখলেই রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব। ১৪ দিন কারখানা বন্ধ থাকলে শেষ দিকে হয়তো দেখা যাবে জাহাজগুলো বন্দর ছাড়ার সময় নামমাত্র রপ্তানি নিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যাবে।

বন্দরের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার একক পণ্যভর্তি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় হয়। কভিড লকডাউন চলাকালে পণ্যছাড়ের পরিমাণ নেমে আসে দেড় থেকে দুই হাজার এককে। কিন্তু গত ২০ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত পণ্যছাড়ের পরিমাণ দিনে ৬০২ একক কনটেইনারে নেমে আসে। এই অবস্থায় বন্দরে কনটেইনারজট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৫৭৪ একক। অথচ বন্দরে মোট কনটেইনার রাখা যায় ৪৯ হাজার একক। এর মধ্যে অবশ্য ১৫ শতাংশ স্থান খালি রাখতে হয় কনটেইনার পরিচালন কাজ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য। এই অবস্থায় অচলাবস্থা রোধে বন্দরের বদলে কনটেইনার ডিপোতে পণ্যছাড়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পণ্যছাড় বাড়াতে গেলে কারখানা খোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধু বন্দরকে সচল রাখতে। শাটডাউন রেখে এর চেয়ে ভালো বিকল্প আমাদের কাছে নেই।’



সাতদিনের সেরা