kalerkantho

শুক্রবার । ৬ কার্তিক ১৪২৮। ২২ অক্টোবর ২০২১। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

লকডাউনে স্থবির রাজস্ব আদায়

ফারজানা লাবনী   

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লকডাউনে স্থবির রাজস্ব আদায়

দুই মাস ধরে দেশে করোনাব্যাধির সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। ভয়ংকর এই ব্যাধির প্রকোপ রোধে সরকার বাধ্য হয়ে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউনের পথে হেঁটেছে। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে এবারই প্রথমবারের মতো তৈরি পোশাক খাতসহ শিল্পের প্রায় সব খাতের কলকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ রয়েছে দোকানপাটও। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সমগ্র অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরকারের আয় জোগাড়ে এমন পরিস্থিতিতেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যক্রম চলমান রেখেছে। কিন্তু এনবিআর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজস্ব আদায়ে কাজ করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। গতবারের ঘাটতি ৪৪ হাজার কোটি টাকা। 

এনবিআর সদস্য আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে অনেক রাজস্ব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে করোনায় মারা গেছেন। তার পরও আমরা রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধ রাখিনি। আমরা শুধু অফিসে বসেই কাজ করি না। মাঠ পর্যায়েও যাচ্ছি। তবে কোথায়, কার কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করব? লকডাউনে কলকারখানা, দোকানপাটসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ। মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজস্ব পরিশোধের আহবান জানালে তাঁরা বলছেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য নাই, রাজস্ব কোথা থেকে দেব?’

তিনি আরো বলেন, ‘আমদানি-রপ্তানি কমেছে। বন্দরে পণ্যজট বাড়ছে। মাল ছাড়িয়ে কোথায় রাখবে? আয় কমে যাওয়ায় করদাতারা নিয়মিত কর পরিশোধ করতে পারছেন না।’

সূত্র জানায়, লকডাউনে ভ্যাট আদায়েও ধস নেমেছে। বেচাকেনা না থাকায় ভ্যাট পরিশোধ করতে পারছেন না বেশির ভাগ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এবারের টানা লকডাউন ঘোষণা দেওয়ার পর ঈদের আগেই বিভিন্ন রাজস্ব দপ্তরে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধের সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক আবেদনে জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের কথা। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য পণ্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কারখানা বন্ধ থাকায় আমদানীকৃত কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছলেও সেগুলো ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে না। অথচ লকডাউনে আয় না থাকলেও শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

অনেক দোকানের মালিকও একইভাবে জানিয়েছেন, বেচাকেনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেও কর্মচারীর বেতন, দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় শুল্ক খাতে আয় কমেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে টিকে থাকতে কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের জনবলের বেতন কমিয়ে দিয়েও টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

করোনার কারণে চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে। কমেনি ঘরভাড়া, খাবার ও সন্তানের পড়ালেখার খরচ। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক অনটনে সাধারণ আয়ের মানুষের পক্ষে নিয়মিত কর পরিশোধ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জোরালো আবেদনেও চলতি অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা আগের মতোই আছে। মাসে প্রকৃত আয় ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব কষে কর পরিশোধের বিধান থাকলেও অধিকাংশ মানুষ আর্থিক সংকটে তা পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গত বছর করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। শুল্ক খাতেও রাজস্ব আদায় কমেছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বন্দরে পণ্য এসে পৌঁছালেও তা ছাড়িয়ে নিয়ে কোথায় রাখবে এই অনিশ্চয়তায় পণ্য গ্রহণ করছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশির ভাগ বন্দরে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে পণ্য পড়ে আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার একক পণ্যভর্তি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় হয়। আর লকডাউনে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার এককে নেমে আসে। কিন্তু ২০ জুলাই থেকে পণ্য ছাড়ে স্থবিরতা বেড়েছে। ২১ ও ২২ জুলাই বন্দর থেকে কোনো পণ্য ছাড়ই করা হয়নি। ২৩ জুলাই মাত্র ৩৯ একক ও পরদিন ২৪ জুলাই তা ৬০০ এককে নেমে যায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রাজস্ব কয়েক গুণ কমেছে।

এভাবে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সব খাত থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। করোনার কারণে সামগ্রিকভাবে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার প্রকোপ কবে কমবে তার নিশ্চয়তা নেই। এদিকে করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট আসায় করোনার তৃতীয় ঢেউ চলছে। করোনা রোধে লকডাউনের বিকল্প নেই। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম চলমান রাখলেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি আরো বাড়বে। রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে সরকারের আয় প্রায় বন্ধ। সাধারণ মানুষকে চাপ না দিয়ে সম্পদশালীদের কাছ থেকে তা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।’



সাতদিনের সেরা