kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি খাত শক্তিশালী করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি খাত শক্তিশালী করতে হবে

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের বড় আকারের বেশকিছু উন্নয়ন সাফল্য রয়েছে। আগামী দশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে এমন গল্প আরো প্রয়োজন। তাই আরো গতিশীল করতে হবে বিদ্যমান উন্নয়নের ধারা। এ জন্য শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করতে হবে বেসরকারি খাত। নতুন দফায় সংস্কার শুরু করতে হবে। বাংলাদেশ নিয়ে এমন সম্ভাবনা ও করণীয় তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এক প্রতিবেদনে।

‘কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক (সিপিএসডি)’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে আইএফসি ও বিশ্বব্যাংক। গতকাল ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী, আমলা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ তার বর্তমান উন্নয়ন মডেলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে। তাই উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে নতুন দফায় সংস্কার প্রয়োজন। রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে, জোরালো প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর এ জন্যই বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করতে হবে। অথচ আর্থিক নীতির কারণে এ খাতের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আছে।

বলা হয়, তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের অনন্য সাফল্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। আর এ দুই খাতকে শক্তিশালী হতে সহায়ক হয়েছে সরকারের দূরদর্শী নীতি সহায়তা। শুধু পোশাক খাতেই ৪০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের শক্তিশালী ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জনে ইঞ্জিনের ভূমিকা রেখে আসছে এ দুই খাত। এমনকি করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরও এ দুই খাতের গুরুত্ব প্রতিভাত হয়েছে, কিন্তু রপ্তানির ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় বাজার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে রপ্তানি বৈচিত্রায়ণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, সংস্কার কার্যক্রমে যে বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তার মধ্যে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি, আর্থিক খাতের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা। বলা হয়, ‘বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে খাতগুলো শক্তিশালী সম্ভাবনা রাখে তার মধ্যে রয়েছে পরিবহন ও লজিস্টিকস, জ্বালানি, আর্থিক সেবা, হালকা ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করতে এ খাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আইএফসি জানায়, সিপিএসডি প্রতিবেদনের লক্ষ্য হচ্ছে, সেসব খাত চিহ্নিত করে দেওয়া, যেখানে বেসরকারি খাত ভূমিকা রাখতে পারে, বাজার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এশিয়া এবং প্যাসিফিক অঞ্চলে আইএফসির ভাইস প্রেসিডেন্ট আলফনসো গার্সিয়া মোরা বলেন, ‘মহামারিতে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দেশটি যখন কভিড-১৯ থেকে অর্থনৈতিক উত্তরণের পথে তখন সংস্কার আরো বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আয়ের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং প্রবৃদ্ধি এখন জরুরি অগ্রাধিকারে থাকতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বেসরকারি খাত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি, মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি অর্জনে। এ জন্য শক্তিশালী আর্থিক খাতের সহায়তাও প্রয়োজন।’

সালমান এফ রহমান বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ইকুইটিভিত্তিক বা কম্পানিনির্ভর বাজার, কিন্তু অর্থায়নের উত্স হিসেবে পুঁজিবাজার ব্যবহৃত হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, বন্ডের মাধ্যমে কিভাবে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাজ করছে। শিগগিরই একটি শক্তিশালী বন্ডের বাজার পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএফসির আঞ্চলিক অর্থনীতিবিদ জুলিয়া মিরুনোভা। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ জন্য বন্ডবাজার উন্নয়নে সংস্কার প্রয়োজন। এ ছাড়া তিনি আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংক খাতে করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন।

অনুষ্ঠানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘অর্থায়নের খরচ কমলে (সুদ কম হলে) চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারব।’ তিনি জানান, একটি কম্পানির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থায়ন।

বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পরিচালক মার্সি টেমবন বলেন, ‘বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয়বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা এনে দেওয়া তৈরি পোশাক শিল্প এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আরো বেশি স্থিতিস্থাপক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশকে তার রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। একই সঙ্গে একটি তেজোদীপ্ত ও অত্যাধুনিক বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে হবে, যা কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হবে, যখন সরকারি অর্থের একটি বড় অংশ সমাজিক খাতে প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ ও ভুটানে আইএফসির কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি ওয়ার্নার বলেন, ‘বাংলাদেশ উচ্চমানসম্পন্ন পণ্যের বাজার টার্গেট করে তৈরি পোশাক খাতে নতুন প্রযুক্তির কাজে লাগাতে পারে। এর পাশাপাশি জুতা, চামড়া, ইলেকট্রিক এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থানই আসছে বেসরকারি খাত থেকে। তাই বেসরকারি খাতকে আরো শক্তিশালী ও প্রযুক্তিসম্পন্ন করা সময়ের প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের ২০২১-৪১ রূপকল্পে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সালে। সেই সঙ্গে সব মানুষের কর্মসংস্থান এবং অতিদারিদ্র্যও দূর করা হবে। যদিও সিপিএসডি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চার কোটিরও বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এমনকি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘাটতি তুলে ধরে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ কৃষি ওপর নির্ভরশীল। অকৃষি খাতের ৯১ শতাংশ চাকরি অনানুষ্ঠানিক খাতের। যুবশক্তির ৭৪ শতাংশ নারী বেকার এবং ৫৪ শতাংশ পুরুষ বেকার। অথচ আগামী দশকে প্রতিবছর নতুন করে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান প্রয়োজন।



সাতদিনের সেরা