kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

বীমায় ই-রিসিট চালুতে গড়িমসি

এ এস এম সাদ   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বীমায় ই-রিসিট চালুতে গড়িমসি

বীমা খাতে স্বচ্ছতা ফেরানোর জন্যই গত বছরের মার্চে ই-রিসিট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২১ সালের জুন মাস থেকে রসিদের সঙ্গে ই-রিসিট ও অক্টোবর থেকে পুরোপুরি ই-রিসিট সেবায় চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত মাসে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) থেকে আপাতত ই-রিসিটের বাধ্যবাধকতা স্থগিত রাখতে আইডিআরএকে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, কম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত বীমা গ্রাহকদের কাছ থেকে শতভাগ টেলিফোন, মোবাইল নম্বর অথবা ই-মেইল আইডি সংগ্রহ করতে পারেনি। ইউনিফাইড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম (ইউএমপি) থেকে সব বীমা গ্রাহককে এসএমএস পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ই-রিসিট স্থগিত করলে বীমা খাতে স্বচ্ছতা আনার প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।  বীমায় স্বচ্ছতা আনার জন্যই আইডিআরএ ইউএমপির মাধ্যমে ই-রিসিট সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করে গত বছর। কারণ বর্তমানে পলিসি জমা দিলে গ্রাহক কম্পানি থেকে হাতে লেখার একটি রসিদ পান। আর গ্রাহকের মুঠোফোন ও ই-মেইলে একটি বার্তা দিয়ে নিশ্চিত করা হয়।

তবে ই-রিসিট চালু হলে বীমা কম্পানির সব কার্যক্রম ডাটাবেইসে রেকর্ড থাকবে। আইডিআরএর একটি সূত্র জানায়, ই-রিসিট চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বীমা গ্রাহকরা। কারণ একজন গ্রাহক দীর্ঘ ১০ বছর পলিসি জমা দিলেও অনেক কম্পানি সেই অর্থ দিচ্ছে না। এজেন্ট ও কম্পানি নানা কায়দায় জাল রসিদ তৈরি করে গ্রাহককে বিপদে ফেলে। এতে গ্রাহক তাঁর অর্থ ফেরত পান না। কিন্তু ই-রিসিট চালু হলে সব রেকর্ড থেকে যাবে। ফলে গ্রাহক তাঁর আইডি ও নিজের পরিচয়পত্র দিয়েই ১০ বছরের রেকর্ড বের করতে পারবেন। এই কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, যেহেতু ইউএমপির মাধ্যমে কার্যক্রম হবে, সেহেতু কম্পানি কোথায় অর্থ বিনিয়োগ করছে সেটারও রেকর্ড থেকে যাবে। 

দেশে বর্তমানে ৩৫টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ বীমা কম্পানির ব্যবসা রয়েছে। বেশির ভাগ কম্পানিতে হাতে লেখা রসিদ দিচ্ছে। সূত্র জানায়, দেশে দু-তিনটি সাধারণ বীমা কম্পানি ছাড়া প্রায় প্রতিটি কম্পানির আইটি সক্ষমতা রয়েছে ই-রিসিট চালু করার জন্য। নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক গ্রিন লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ই-রিসিট চালু করার প্রক্রিয়া রয়েছে। আগামী মাসের মধ্যেই ই-রিসিট চালু করা যাবে বলে আশা করছি।’ মেটলাইফ ইনস্যুরেন্স  কম্পানি থেকেও জানানো হয়, তারা ই-রিসিট চালু করছে। 

আইডিআরএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই ই-রিসিট চালু রয়েছে। ভারতে ই-রিসিট চালু না থাকলেও সেখানে ই-পলিসি ডিপোজিটরি রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশে পলিসি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এতে সেসব দেশে বীমার ওপর মানুষের আস্থা থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ই-রিসিট হলে সরকার ট্র্যাকিং করতে সক্ষম হবে। এই খাতে প্রতিবছর চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে।’

গতকাল সোমবার ই-রিসিট কয়েক মাসের জন্য স্থগিত করা হবে কি না, সে বিষয়ে একটি মিটিং হয়। আইডিআরএ অক্টোবর থেকে ই-রিসিট চালু করতে চাচ্ছে। তবে অক্টোবরে না হলেও জানুয়ারি থেকে ই-রিসিট পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে বলে জানা যায়। তবে আইডিআরএর একটি সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, অক্টোবরেই ই-রিসিট চালু করা সম্ভব, যদি না বীমা খাতের রাঘব বোয়ালরা এতে প্রভাব না খাটায়। কারণ ই-রিসিট যত দিন না আসবে তত দিন অর্থ এদিক-সেদিক করা যাবে।

বীমা ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আপাতত ই-রিসিট স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। কারণ সব বীমা কম্পানিতে কম্পিউটারের সুবিধা নেই। আর ই-রিসিটের মতো নতুন একটি প্রযুক্তি অনেক বীমা কম্পানির কর্মকর্তারা জানেন না। তাই এই  আবেদন করা হয়েছে।’ যদিও আইডিআরএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো কম্পানিতে কম্পিউটার থাকবে না, এটা পুরোপুরি অসম্ভব। কম্পিউটার না থাকলে বীমা কম্পানি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেটা দেখার প্রয়োজন আছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘কম্পানিগুলো ই-রিসিট ডাউনলোড করেই তার গ্রাহককে সহজেই প্রদান করতে পারবে। এটা এমন কোনো কঠিন কাজ না। আইডিআরএ কিন্তু এক বছরের বেশি সময় দিয়েছিল বীমা কম্পানিগুলোকে। কিন্তু এখন এসে স্থগিত করতে বলা হচ্ছে। আসলে দেশের বীমা খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই একটা সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকার একটি স্মার্টফোন থাকলেই ই-রিসিটের সুবিধা দেওয়া সম্ভব। এটি চালু হলে পুরো বীমা খাতে স্বচ্ছতা আসবে, কম্পানিগুলোর কার্যকারিতা বাড়বে, বীমা নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে, বীমা খাত আরো বড় হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হবে।’



সাতদিনের সেরা