kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

সুদের হার কমলেও চাহিদা নেই

ফের গতিহীন বেসরকারি ঋণ

♦ জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে
♦ শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে প্রায় ২৯.৬৪ শতাংশ

জিয়াদুল ইসলাম   

১৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফের গতিহীন বেসরকারি ঋণ

সুদের হার কমলেও বেসরকারি খাতে ঋণে গতি আসছে-ই না। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশ খানিকটা বাড়লেও মার্চে আবার কমে গেছে। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতি আবারও ধীর হয়ে পড়েছে। এখন পণ্যের আমদানিও কম হচ্ছে। এর প্রভাবে শিল্প খাতে পণ্যের উৎপাদন কম হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাহিদা কমায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়ছে না। এ ছাড়া অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহকে নিরুৎসাহী করা এবং বিদ্যমান কুঋণের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতামূলক ও সংযত নীতি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী আমদানি কমছে। এর মানে উৎপাদনের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। এসব কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। এটা অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।

প্রথম দফার করোনার প্রভাবে আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে, লকডাউনের কারণে গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির ছিল। তবে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এটা কাটিয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সবাই। এরই মাঝে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিকে নতুন শঙ্কায় ফেলেছে। আমদানি, রপ্তানি ও বিনিয়োগে সেই শঙ্কার ছাপ আবার স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে। এর মধ্যে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে প্রায় ২৯.৬৪ শতাংশ। মধ্যবর্তী শিল্পপণ্যের আমদানি কমেছে ৯.৪০ শতাংশ। কাঁচামালের আমদানি কমেছে ১.৭৭ শতাংশ। সব মিলে সার্বিক আমদানি কমেছে ৭.৩৮ শতাংশ। উল্লেখ্য, কারখানা সম্প্রসারণ, সংস্কার ও নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। এ জাতীয় পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে কারখানার সম্প্রসারণ ও সংস্কার কম হচ্ছে।

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কায় নতুন বিনিয়োগ আবার থমকে গেছে। এতে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিও গতিহীন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৪.৮ শতাংশ। এর বিপরীতে মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮.৭৯ শতাংশ। আগের মাস ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৮.৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানেই প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ০.১৮ শতাংশ। মূলত দেশে করোনার আঘাত আসার আগে থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি বিরাজ করছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব ও ঋণের উচ্চ সুদহার। এমন প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু করোনার প্রথম ধাক্কায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্টো আরো কমে যায়। এ সময়ে ঋণ যেটুকু বাড়ে তা ছিল মূলত করোনার ক্ষতি পোষাতে সরকারঘোষিত স্বল্প সুদের প্রণোদনানির্ভর ঋণ। আর এই প্রণোদনানির্ভর ঋণে ভর করে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে টানা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়তে দেখা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন মাস বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ০.৮৭ শতাংশ বেড়ে ৯.৪৮ শতাংশে ওঠে। তবে তা অক্টোবর থেকে আবার নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। গত অক্টোবরেই এক লাফে ০.৮৭ শতাংশ কমে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮.৬১ শতাংশে নেমে আসে। নভেম্বরে তা আরো ০.৪০ শতাংশ কমে নেমে আসে ৮.২১ শতাংশ। এটি ছিল স্মরণকালের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। তবে ডিসেম্বরে তা সামান্য বেড়ে ৮.৩৭ শতাংশে উঠলেও জানুয়ারিতে আবার ৮.৩২ শতাংশে নেমে আসে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা এক লাফে বেশ খানিকটা বেড়ে ৮.৯৩ শতাংশে উঠলেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় মার্চে আবার তা ৮.৭৯ শতাংশে নেমে আসে।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি না বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বাড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল দুই লাখ চার হাজার কোটি টাকা।