kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

সঞ্চয়পত্র থেকে আসবে ৩২ হাজার কোটি টাকা

সজীব হোম রায়   

১৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সঞ্চয়পত্র থেকে আসবে ৩২ হাজার কোটি টাকা

করোনা মহামারির মাঝে মানুষের আয় কমলেও বেড়েছে সঞ্চয় প্রবণতা। আর গ্রাহকরা সঞ্চয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন সঞ্চয়পত্র। ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে সরকারের ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে তাই সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমাতে চায়। এই খাত থেকে প্রতি অর্থবছরেই বড় ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আগামী বাজেটেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির ধারা কমবে না। তাই বাধ্য হয়েই ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবং অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনায় মানুষের সঞ্চয়ের আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংকে সুদের হার কম। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি আছে। তাই নিরাপদ বিবেচনায় মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে। আবার সরকারেরও ঘাটতি মেটাতে অর্থের প্রয়োজন আছে। রাজস্ব আহরণ কম। তাই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রই ভরসা। তাই হয়তো আগামী বাজেটে সরকার এ খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াচ্ছে।

সূত্র মতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে ৮৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। আর ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়ে গেছে ৭৫ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এটি বিগত পুরো অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়েও সাত হাজার ৯৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বা ১২ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, চলতি অর্থবছর শেষে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সঞ্চয়পত্র যত বিক্রি হয় সরকারের ঋণও এই খাত থেকে তত বাড়ে। কারণ বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর প্রতি মাসে যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি বলা হয়। অর্থনীতির পরিভাষায় নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রিকে সরকারের ঋণ হিসেবে ধরা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, করোনা মহামারিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমবে। সেই সঙ্গে এই খাত থেকে সরকারের ঋণের বোঝাও কমে আসবে। কিন্তু হয়েছে উল্টো। ব্যাংকগুলোতে আমানতের বিপরীতে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে মানুষ। এসব বিষয় আমলে নিয়ে আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াচ্ছে সরকার। আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আছে ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত হিসাবে আগামী বাজেটে এ খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে দুই হাজার কোটি টাকা।

বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ধরা হয়েছিল ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৫০ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৯০ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা একটি রেকর্ড।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমাতে সরকারের যত উদ্যোগ : সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ কমাতে সরকার গত বাজেট থেকে নানা উদ্যোগ নেয়। বিক্রির চাপ কমাতে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরো কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একক ও যৌথ নামে কেনার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথ নামে এক কোটি টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এর পরও সঞ্চয়পত্র বিক্রির চাপ কমানো যায়নি।