kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

টিকে থাকার লড়াইয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

রোকন মাহমুদ   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



টিকে থাকার লড়াইয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা

বেশির ভাগ জুয়েলারি দোকানই প্রতিদিনের খরচ তুলতে পারছে না। ছবি : কালের কণ্ঠ

একে তো উচ্চমূল্য, তার ওপর করোনা মহামারিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। বন্ধ সামাজিক অনুষ্ঠানাদিও। সব মিলিয়ে সোনা-রুপার ব্যবসায় চরম মন্দা চলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশির ভাগ দোকানই এখন প্রতিদিনের খরচটাও তুলতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে রোজায় সামাজিক অনুষ্ঠানাদি বন্ধ থাকলেও ঈদকে কেন্দ্র করে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিক্রি বাড়ে। এ ছাড়া ঈদের পরের বিয়ে-শাদিসহ সামাজিক অনুষ্ঠানাদির জন্য অনেকে অগ্রিম ক্রয়াদেশ দিয়ে রাখেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে ঈদের পরও বন্ধ থাকছে বিয়ে-শাদি। ঈদের আগেও কিনতে পারছেন না আর্থিক সংকটে। এ কারণে অনেক ক্রেতা আগের জমানো সোনা বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও ব্যবসায়ীরা জানালেন।

গতকাল রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় সোনার দোকানগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাশূন্য প্রায় প্রতিটি দোকান। নিউ মার্কেটের সবচেয়ে বড় দোকান সানন্দা জুয়েলার্সেও অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা। মার্কেটের সিরাজ জুয়েলার্সসহ অন্যান্য দোকানেও একই অবস্থা।

কথা হয় সিরাজ জুয়েলার্সের মালিক ও নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মার্কেটের এমন দোকানও রয়েছে দৈনিক বিক্রি মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এমন বিক্রি থেকে যা মুনাফা আসে তার চেয়ে দোকানের দৈনন্দিন খরচ দিতে হয়। প্রতিদিন একটা দোকানে কর্মচারীদের খরচ, বিদ্যুৎ বিল ও ইফতার খরচ বাবদ যে টাকা খরচ হয় বিক্রি থেকে তাও উঠছে না। অর্থাৎ এখন দোকান খোলা রাখলেই প্রতিদিন লোকসানে পড়ছেন মালিকরা। সামনের দিনগুলোতে বিক্রি ভালো হবে এমন আশাও দেখছি না। ফলে ঈদের আগে কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ কিভাবে মেটাব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি আমরা।’

জানা যায়, করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে সোনার দাম একটু একটু করে বাড়তে থাকে আন্তর্জাতিক বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারেও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গত বছরের শেষ দিকে দেশের বাজারে সোনার দাম ৭০ হাজার টাকা ভরি ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ ১০ মে সোমবার সোনার গহনার দাম প্রতিভরি দুই হাজার ৩৩৩ টাকা বাড়ায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। নতুন দর অনুসারে দেশে ২২ ক্যারেটের অলংকারের কিনেত ভরিপ্রতি দাম পড়বে ৭১ হাজার ৪৪২ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেট ৬৮ হাজার ২৯৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৫৯ হাজার ৫৪৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার অলংকারের ভরি বিক্রি হবে ৪৯ হাজার ২২২ টাকায়।

এর আগে ১০ মার্চ থেকে ২ হাজার ৪১ টাকা কমে প্রতিভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হয়েছে ৬৯ হাজার ১০৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের ৬৫ হাজার ৯৬০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৫৭ হাজার ২১১ টাকা বিক্রি হয়েছে। করোনার আগে সোনার ভরি ছিল ৬০ হাজার টাকার আশপাশে। আন্তর্জাতিক বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিংইকোনোমিকসের তথ্য মতে, গত এক মাসে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়েছে ৬.১২ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি আউন্স সোনা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮৩৮ ডলারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দাম আরো বাড়বে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা মহামারির ধাক্কায় মাধ্যবিত্ত তো বটেই অনেক উচ্চবিত্তও বাজেটে হিমশিম খাচ্ছেন এই দামে স্বর্ণ কিনতে। যাঁরা উপহারের জন্য টুকটাক কিনতেন তাঁরা আর এখন স্বর্ণ কিনছেন না, এর পরিবর্তে অন্য কিছু দিয়ে উপহারের কাজ শেষ করছেন। ঈদ উপলক্ষে অনেকে ছোট ছোট সোনার গয়না কিনতেন তাঁদের মধ্যে যাঁরা এখনো সামর্থ্যবান তাঁরা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হন না। আর অধিকাংশই সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক ক্রেতা আগের কেনা স্বর্ণ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাচ্ছেন বলেও জানালেন বিক্রেতারা।

তাঁরা বলছেন, যদি কোনো বিক্রেতা গড়ে এক ভরি করে স্বর্ণ বিক্রি করতে পারেন। তা হলেও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পারবেন। কিন্তু এখন যে অবস্থা চলছে তাতে গড়ে এক ভরিও বিক্রি হচ্ছে না। কোনো কোনো ব্যবসায়ীর হয়তো হচ্ছে; কিন্তু তুলনামূলকভাবে তাঁর খরচও বেশি। সে হিসেবে সবার একই অবস্থা বলা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বায়তুল মোকারমের মাঝারি মানের একজন ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে মার্কেট খোলার অনুমতি দেওয়ার পর থেকে দুই দিন বিক্রি হয়েছে আমার দোকানে। দুই দিনে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৪ হাজার টাকা। এটা মূল বিক্রি। এ থেকে যে কয় টাকা লাভ হবে তা এক দিনের দোকানের চলতি খরচও নয়। এভাবে চলতে থাকলে দোকান বন্ধ রাখাই ভালো মনে হচ্ছে।’