kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

মোবাইল ওষুধ ও সিগারেটে রাজস্ব আদায়ের ছক

ফারজানা লাবনী   

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মোবাইল ওষুধ ও সিগারেটে রাজস্ব আদায়ের ছক

আগামী অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোবাইল, সিগারেট এবং ফার্মাসিউটিক্যাল (ওষুধ) খাতের ওপর নির্ভর করে ছক কষছে। বড় অঙ্কের কর ফাঁকি উদঘাটনে জোর দিয়েছে। অডিটে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করবে। করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা আগামী অর্থবছরেও থাকছে। আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধে উচ্চহারের কর থাকবে। সম্পদশালীদের ওপর সারচার্জ এবং সুপারট্যাক্স গ্রুপের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা থাকবে। এসব নির্দেশনা আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা যায়।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরকে আগামী অর্থবছরের জন্য চলতিবারের সমান লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সামনে রেখে রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রণয়নের কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআরসংশ্লিষ্টরা করোনাকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এ লক্ষ্যমাত্রা কমানোর আবেদন জানালেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তা আমলে নেওয়া হয়নি। শেষ চেষ্টা হিসেবে এনবিআর থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত রাজস্ব বাজেটসংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে  বৈঠকে লক্ষ্যমাত্রা কমানোর আবেদন জানাবে।

গত বছরের মার্চ থেকে এ দেশের করোনার প্রকোপ শুরু হয়। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে শিল্প খাতে গতি নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও ভালো না। সমগ্র অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। এতে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। রাজস্ব আদায়ে গত অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসের (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ৪৯ হাজার কোটি টাকা। করোনার প্রকোপ কমেনি, কবে কমবে তার নিশ্চয়তাও নেই। রাজস্ব আদায়ে বড় অঙ্কের ঘাটতির মুখে চলতি অর্থবছরের জানুয়ারিতে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। চলতি জুলাই- ফেব্রুয়ারিতে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয় এক লাখ ৭৮ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। জুলাই থেকে মার্চে ঘাটতি ছিল ৪৯ হাজার ৫০১ কোটি টাকা।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প খাতে মন্দা থাকলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষে হিসাব মতো রাজস্ব পরিশোধ সম্ভব না। এমন পরিস্থিতিতে ঘাটতি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ঘাটতি ছিল বলেই সরকার লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়েছে। তাই করোনাকালীন সংকটের মধ্যেও আগামী অর্থবছরে চলতি অর্থবছরের শুরুতে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। এতে সমগ্র অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের তিন খাতের মধ্যে ভ্যাট খাতে আদায় সবচেয়ে বেশি এক লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে আদায়ের ওপর মোট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নির্ভর করে। এবারে মোট রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক ধারা থাকলেও মার্চ পর্যন্ত সিগারেট, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মোবাইল খাতে ভ্যাট আদায় গত অর্থবছরের তুলনায় গড়ে ১৭ শতাংশ বেড়েছে। এই তিন খাতের লক্ষ্যমাত্রা মোট ভ্যাটের অর্ধেকের বেশি। গত মার্চ পর্যন্ত ৪০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

এই তিন খাতের ভ্যাট আদায় হয় বৃহৎ করদাতা ইউনিটের থেকে। কমিশনার ওয়াহিদা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে ওষুধ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী কিনতে বাধ্য হয়েছে সাধারণ মানুষ। এতে এই দুই খাতে করোনার আগে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় করোনার মধ্যে কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে। এতে ভ্যাট আদায়ও বেশি হয়েছে। করোনায় মোবাইলের ব্যবহারও বেড়েছে। তাই এ খাতে ভ্যাট আদায়ও বেশি হয়েছে। 

এনবিআরের রাজস্ব বাজেট প্রস্তুতসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, করোনাকালীন সংকটে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ফার্মাসিউটিক্যালশিল্পের বিক্রি করোনার আগের সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। করোনা ব্যাধির প্রকোপ কবে কমবে তার কোনো সময়সীমা নেই। করোনা ব্যাধির প্রকোপ আগামী অর্থবছরেও চলতে থাকলে এই দুই খাতের রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। অন্যদিকে আগামী অর্থবছরেও সিগারেটের ওপর উচ্চহারে কর বহাল থাকবে। চলতি বাজেটে সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ৫৫ শতাংশ থেকে ৫৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। এতে কম দামি সিগারেটের দাম গড়ে দুই টাকা, মাঝারি দামের সিগারেটে গড়ে চার টাকা এবং বেশি দামের সিগারেটের দাম গড়ে পাঁচ টাকা বেড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সকলে আশা করি করোনা ব্যাধি থেকে মুক্ত হব। কিন্তু তা কবে হবে তা অনিশ্চিত। তাই করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ে ছক কষতে হচ্ছে। আগামীতেও মোবাইল, ওষুধ এবং সিগারেট খাত থেকে ভালো আদায় হবে ধরে নিয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।’