kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

বিনা জামানতে ঋণের ব্যবস্থা করলেন ডিসি

কচুরিপানার সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশে

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কচুরিপানার সামগ্রী যাচ্ছে বিদেশে

কচুরিপানা দেখলেই অনেকে গেয়ে ওঠেন সেই বিখ্যাত গান ‘থাকিলে ডোবা খানা হবে কচুরিপানা’। যারা খাল-বিল, পুকুর ও নদীতে জন্ম নেওয়া কচুরিপানাকে অপ্রয়োজনীয়, পচনশীল উদ্ভিদ এবং মশক উত্পাদন কেন্দ্র বলে মনে করেন তাঁরা নিশ্চিত অবাক হবেন যদি শোনেন ৫০ টাকা কেজি দামে গাইবান্ধায় প্রতি কেজি কচুরিপানা বিক্রি হয়। শুকনা কচুরিপানার ডাঁটা দিয়ে তৈরি নানা সামগ্রী রপ্তানি হয় বিদেশে—এই খবরটিও তাঁদের কাছে হবে একবারে নতুন। অথচ বাস্তবে তাই ঘটেছে। গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের মদনের পাডা গ্রামের যুবক সুভাষ চন্দ্র বর্মণ এই নতুন খবরের রূপকার। তাঁর কীর্তি এখন লোকের মুখে মুখে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন বিসিকের মাধ্যমে তাঁর জন্য জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করেছেন।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সুভাষের বিশাল কর্মযজ্ঞ। তিনি অপ্রয়োজনীয় কচুরিপানার ব্যতিক্রমী ব্যবহার শুরু করেছেন। নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন কচুরিপানাকেন্দ্রিক চারটি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান। তিনি প্রতি মাসে স্থানীয়ভাবে কচুরিপানা কিনে থাকেন। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকেও আসে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা শুকনা কচুরিপানা। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে গ্রামের আড়াই শতাধিক নারী ও কিশোরী কাজ করেন।

যাঁদের হাতে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন ফুলের টব, ব্যাগ-বালতিসহ নানা ধরনের সামগ্রী। দেশীয় বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কম থাকলেও রপ্তানি হয় ইন্দোনেশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে। তবে পুঁজির অভাবে এখন পর্যন্ত লাভের অঙ্ক তেমন বড় না। তার পরেও সুভাষ থেমে নেই। তাঁর সঙ্গে থাকা কিশোরী, তরুণী, গৃহবধূরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। মাস গেলে তাঁদের হাতে আসছে বেশ কিছু টাকা। এ জন্য সুভাষ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চান।

দৃশ্যটি আসলেই অবাক করার মতো। গ্রামের নারী ও কিশোরীরা একসঙ্গে বসে কচুরিপানার ডাঁটা দিয়ে তৈরি করছেন নানা ধরনের শৌখিন পণ্য। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে বাড়ির কাজের পাশাপাশি নারীরা নেমে পড়ছেন এই কাজে। তৈরি করছেন কচুরিপানার ব্যাগ, বালতি, ফুলের টবসহ নিত্যনতুন শৌখিন পণ্য। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অবসর সময়টা এভাবেই কাটছে শিক্ষার্থীদের। এতে পড়ালেখার ব্যয়ের পাশাপাশি নিজের খরচ ছাড়াও মাস শেষে আট থেকে দশ হাজার টাকা আয় করছেন তাঁরা।

এলাকার তরুণী উম্মে কায়সারা জানালেন, বছরখানেক আগে সুভাষ স্যার ও তাঁর স্ত্রী তাঁদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। অনেক যত্ন করে শেখান নানা ধরনের সামগ্রী তৈরির কাজ। প্রথম দিকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টি মাথায় ছিল না। করোনার প্রথম দিকে সারা দিন কাজ করে ১০০-১৫০ যা পাওয়া যেত তাই পরিবারের জন্য মূল্যবান ছিল। তারপর তৈরি জিনিস বাইরে নিয়মিত যাওয়া শুরুর পর এখন পারিশ্রমিকের অঙ্ক বেড়েছে। কাজ করতে ভালোই লাগে। গৃহবধূ সালমা বেগম বলেন, ‘আড়াই শ নারী একসঙ্গে বসে কাজ শিখি। জিনিসপত্র বানাই। সেগুলো বিদেশ যায়। আমাদের মন ভরে যায়। সুভাষ দা আমাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দেন।’

সুভাষের স্ত্রী কল্পনা রানী বর্মণ বললেন, ‘তাঁর স্বামী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখে নিজের গ্রামে এসে দরিদ্র নারীদের কাজ শেখান। তবে তাঁর নিজের কোনো জায়গা নেই, শ্বশুরবাড়িতেই তাঁকে থাকতে হচ্ছে। তাঁদের বানানো জিনিস ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠালে তারা নিজেদের অংশ কেটে নিয়ে লাভের টাকা পাঠায়। কখনো কখনো স্থানীয়ভাবেও কচুরিপানা কিনতে হয়। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরো বেশি নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব হবে।’

কচুরিপানাকেন্দ্রিক কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা সুভাষ চন্দ্র বর্মণ বললেন, ‘২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছর ঢাকার একটি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখে স্ত্রীকে নিয়ে ২০১৬ সালে বাড়ি ফিরে কাজটি শুরু করি। প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু করলেও এখন জেলার চারটি এলাকায় আড়াই শতাধিক নারী ও কিশোরী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আমার নদীভাঙন কবলিত এলাকার নারীদের জন্য আরো বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। মানবিক কারণে জেলা প্রশাসক সেই সুযোগটি করে দিলেন।’

এদিকে জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু রায়হান দোলন, বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রবীনচন্দ্র রায়সহ অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে সুভাষের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি কচুরিপানার এই কুটির শিল্পটিকে বিকশিত হতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। বিসিক কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি এই সপ্তাহের মধ্যে সুভাষের জন্য বিনা জামানতে তাত্ক্ষণিকভাবে দুই লাখ টাকা ঋণের ব্যবস্থা করেন। ডিসি বলেন, ‘সুভাষ তার শিল্পকে বিকশিত করতে পারলে তার এই লোনকে পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করার ব্যবস্থা করা হবে।’



সাতদিনের সেরা