kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

করোনার ধাক্কায় শ্রমিক ছাঁটাই

ফারজানা লাবনী   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনার ধাক্কায় শ্রমিক ছাঁটাই

গত ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরু হলে বড় শিল্প-কারখানায় খরচ কমাতে এরই মধ্যে বদলি শ্রমিক বাদ দিয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের কারখানাগুলোতেও খরচ কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। কাজ হারানো স্বল্প আয়ের এসব শ্রমিক এত দিন বেতনের সবটা দিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেয়েছেন, সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। করোনায় নতুন কাজও নেই। এমন পরিস্থিতিতে কাজ হারানো শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

গত দুই দফার লকডাউনে পুরান ঢাকার মাঝারি মাপের জুতার কারখানা আশিক জুতা ফ্যাক্টরি থেকে এক জোড়া জুতাও কেনেনি কেউ। তৃতীয় দফায় লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর খবরে জুতা কারখানার মালিক ব্যবসার ব্যয় কমাতে গতকাল বিকেলে শফিউল ইসলামসহ (৪০) আট শ্রমিককে ছাঁটাই করেন। চলতি মাসের গত ২০ দিনের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে এই আট শ্রমিককে কারখানায় আসতে না করেছেন।

কাজ হারানো শ্রমিক শফিউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, লকডাউনে কারখানায় বিক্রি নাই। মালিক ব্যবসায়ের খরচ কমাতে আমাদের কয়েকজনকে ছাঁটাই করেছেন। করোনার মধ্যে কোথাও নতুন চাকরি নাই। বেতনের টাকা দিয়ে দিন চালানো কঠিন ছিল। এক টাকাও জমাতে পারিনি। এখন পরিবারের খরচ চালাব কিভাবে?

আশিক জুতা ফ্যাক্টরির মালিক আব্বাস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদ সামনে থাকলেও এবারের লকডাউনে এক জোড়া জুতা বা স্যান্ডেলও বিক্রি হয়নি। করোনা শেষ না হলে দোকানপাট স্বাভাবিকভাবে খুলবে না। ক্রেতাও পাওয়া যাবে না। বিক্রি না থাকলেও কারখানার পানি ও বিদ্যুৎ বিল, কারখানার ভাড়া, শ্রমিকদের বেতনসহ সব খরচ ঠিকই আছে। লকডাউনে কিভাবে নিজে চলব? কারখানার খরচ কিভাবে চালাব? কিছুই ভাবতে পারছি না। বাধ্য হয়ে খরচ কমাতে জনবল কমিয়েছি।

আশিক জুতা ফ্যাক্টরির মতো কম আয়ের অনেক প্রতিষ্ঠানই করোনায় ব্যবসার খরচ কমানোর সহজ উপায় হিসেবে শ্রমিক ছাঁটাই করা শুরু করেছে। অন্যদিকে লকডাউন শুরু হওয়ার পর অধিকাংশ বড় মাপের প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধির অজুহাতে বদলি শ্রমিক বাদ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা সরকারি নির্দেশে বদলি শ্রমিক কমিয়েছে বলে জানিয়েছে। কাজ হারানো বদলি শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে সংসারের খরচ চালাতে দিশাহারা।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শতাধিক কারখানায় ৩৪ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছে। এর মধ্যে বদলি শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। লকডাউনের মধ্যে কিভাবে কারখানা পরিচালিত হবে তার সরকারি নির্দেশনায় করোনা রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কারখানায় জনবল কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি কারখানায় বদলি শ্রমিক বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শিল্পসচিব কে এম আলী আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা করোনা রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কারখানায় নিয়মিত শ্রমিক রেখে বদলি শ্রমিক বাদ দিয়েছি।’

গাজী ওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. গোলাম কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার প্রকোপে লকডাউনে অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের এই প্রতিষ্ঠানও ভয়াবহ আর্থিক সংকটে আছে। পণ্য বিক্রি করতে না পারায় আয় নেই। ব্যয় কমাতে ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বদলি শ্রমিক বাদ দিয়েছি। সরকারি নির্দেশেই কারখানায় জনবল কিছুটা কমাতে হয়েছে। আমরা নিরুপায় হয়ে টিকে থাকতে এ কাজ করেছি।’

গাজী ওয়্যারসের বদলি শ্রমিক আবুল আহাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রায় তিন বছর ধরে এই মিলে বদলি হিসেবে কাজ করছি। গত বছর করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পরও আমার কাজ ছিল। এবারের লকডাউনের প্রথম দিন থেকেই আমার কাজ নাই। কাজ না থাকলে বেতনও নাই। তিন বেলা কিভাবে আমার ও আমার পরিবারের খাবার জুটাব এখন তাই নিয়েই দিশাহারা। আশপাশের দু-একটি কারখানায় কাজের চেষ্টা করেছি, করোনার কারণে কারখানার মধ্যে ঢুকতেই দেয় না। কাজ তো দূরের কথা।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মুনতাকিম আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা ব্যাধি থেকে বাঁচতে লকডাউন প্রয়োজন। করোনা ভয়াবহ ব্যাধি। করোনার টিকা আবিষ্কার হওয়ার পরও এই ব্যাধির প্রকোপ আবারও বাড়বে—এর জন্য অনেকেই প্রস্তুত ছিল না। বেসরকারি খাতের বড় মাপের অধিকাংশ কারখানায় নিয়মিত শ্রমিকের সংখ্যা আগের মতোই আছে। তবে অনেকে বদলি শ্রমিক বাদ দিয়েছে। মাঝারি ও ছোট মাপের অনেক প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে কারখানার ব্যয় কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিরুপায় হয়ে অনেকে জনবল কমিয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, লকডাউনে বড় কারখানার চেয়ে ছোট কারখানা বেশি আর্থিক সংকটে পড়বে। কারণ এসব কারখানায় বড় ধরনের পুঁজি থাকে না। আয় করে তাই দিয়েই ব্যয় করে। আয় থেকে শ্রমিকের বেতন দিয়ে থাকে। লকডাউনে আয় না থাকলে শ্রমিকের বেতন কোথা থেকে দেবে। অন্যদিকে কাজ হারানো শ্রমিকদের কাজ না থাকলে না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা হবে। তাঁরা এ মুহৃর্তে নতুন কাজও পাবেন না। এসব শ্রমিকের বেতন এত কম থাকে যে কোনো সঞ্চয় করার সুযোগ থাকে না।



সাতদিনের সেরা