kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

করোনার দুর্দিনে করের চাপে ব্যবসায়ীরা

এম সায়েম টিপু   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার দুর্দিনে করের চাপে ব্যবসায়ীরা

সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসবে। এ সময় বিশ্বের বড় দেশগুলো থেকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাবে। ফলে দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়বে। অন্যদিকে করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ মন্দার। আবার ব্যবসায়ীদের ওপর উচ্চহারে করের চাপ তাঁদের হতাশায় ফেলে দিয়েছে। ফলে তাঁরা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিকল্প পথ খুঁজছেন।

এই বিষয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দায়ী করছেন দেশের সার্বিক কর ব্যবস্থাকে। তাঁরা মনে করেন উচ্চ করহার, কর নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, করনীতি এবং কর প্রশাসন এবং কর কর্মকর্তাদের ঐচ্ছিক ক্ষমতার কারণে ব্যবসায়ীরা এমন হতাশা প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিংয়ের অস্বচ্ছতাও অনেকাংশে দায়ী। 

এদিকে সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে এপেক্স ফুট ওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘দেশের করব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ, যা ব্যবসা সহায়ক নয়। অবস্থাটা এমনই যে এর কারণে ব্যবস্যা বন্ধ করে দেওয়াই উচিত। আমরা যাঁরা বাংলাদেশে ব্যবসা করি পারলে কালকেই কান ধরে ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাই। লাভ হবে লোকসান হবে। ব্যবসা থাক আর না থাক কর কর্মকর্তারা করের চাপ দিয়েই যাবেন।  যাঁরা কর দেন না তাঁরাই ভালো থাকবেন।’

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের সার্বিক কর ব্যবস্থাপনা ব্যবসা সহায়ক নয়। এর কারণ উচ্চ করহার,  যা আমাদের মতো একই ধরনের দেশে অনেক কম।’

বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘থাইল্যান্ডে করপোরেট কর ২০ শতাংশ। ভিয়েতনামে ২০-২২ শতাংশ, ভারতে ২২ শতাংশ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২৪ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ২০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে করপোরেট কর দিতে হয় ৩২.৫ শতাংশ।’

বিনিয়োগে করনীতি একটি বড় বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের করনীতির কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এ ছাড়া করনীতি এবং কর প্রশাসন একই জায়গায় হওয়ার ফলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কর কর্মকর্তাদের ঐচ্ছিক ক্ষমতা দেওয়ার ফলে তাঁরা ব্যবসার লাভ-লোকসানের কথা বিবেচনা না করে ওই ক্ষমতার ভিত্তিতে কর আদায় করে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।’

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা দরকার। উন্নত দেশগুলো যা ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে করেছে এবং সফল হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে।’ তিনি বলেন, দেশের তিন স্তরের করব্যবস্থা আছে—ভ্যাট, আমদানি কর এবং আয়কর। এর মধ্যে আয়করের ডিজিটাইজেশন একেবারেই হয়নি বলে মনে করেন তিনি। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি বেসরকারি খাতনির্ভর। এর মাধ্যমে এগিয়ে যাবে দেশ। কিন্তু  কর কাঠামো তুলনামূলক অনেক বেশি দুর্বল বলে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বেশি। ফলে ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় বাড়ে। এ ছাড়া কভিডে এ সময় যখন ব্যবসার আয় কমছে, তখন উচ্চ করহারের ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর আরো বেশি চাপে পড়ছে। এর ফলে কর-পরবর্তী আয় কমে যায়। তাই এ সময় করের চাপ না বাড়িয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রণোদনা দেওয়া গেলে ব্যবসায়ীরা এমন দুর্যোগেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটাও গুরুত্বপূর্ণ, ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতা আনাও দরকার। যার মাধ্যমে সরকার প্রকৃত আয়ের চিত্র পাবে। এতে রাজস্ব আহরণের স্বচ্ছতা আসবে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা কর কাঠামো থেকে সরকারের দেওয়া সুবিধা পবেন।’

উচ্চহারে করের চাপে ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হয় উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (আরএপিআইডি) চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের কর কাঠামোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং অনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসায়ীদের নাজেহাল হতে হয়।  এ ছাড়া একবার তাঁরা করজালে ঢুকে গেলে আর বের হয়ে আসতে পারেন না। অথচ যাঁরা কর দেন না, তাঁদের এ নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেই। অন্যদিকে করোনার প্রভাবে গত বছর ব্যবসা হয়নি; এ বছরেও করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’