kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

লকডাউনে হালখাতা ‘লক’

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



লকডাউনে হালখাতা ‘লক’

পহেলা বৈশাখ। নতুন বছর, নতুন করে সারা দেশের মতো বাকির খাতা খোলেন ঝালকাঠির ব্যবসায়ীরা। এদিন পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্রেতারাও তাদের বকেয়া পরিশোধ করেন আনন্দে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় হালখাতা উৎসবের। মিষ্টিমুখ করাতে গ্রাহকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এ বছর পহেলা বৈশাখে কঠোর লকডাউন দিয়েছে সরকার। তাই ঝালকাঠির ব্যবসায়ীদের বকেয়া ওঠানোর সেই হালখাতা উৎসবে ভাটা পড়েছে। একদিকে বকেয়া না পাওয়ার যন্ত্রণা, অন্যদিকে লকডাউনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। শুধু এ বছরই নয়, গতবারও একই অবস্থার শিকার হয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা।

সুগন্ধা নদীর তীরঘেঁষা দেশের প্রাচীনতম জনপদ ঝালকাঠি। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ঝালকাঠি বন্দরকে পৌরসভা ঘোষণা করে। সেই থেকে শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাসণ্ডা নদীর তীরে গড়ে ওঠে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পাল তোলা সাম্পান (ট্রলার) ভিড়ত সুগন্ধা ও বাসণ্ডা নদীর বিভিন্ন ঘাটে। বাণিজ্যিক বন্দর ঝালকাঠিকে তখন বলা হতো দ্বিতীয় কলকাতা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ঝালকাঠির ব্যবসায়ীরা স্থানীয় গ্রাহকদের বাকিতে কেনাকাটার সুযোগ করে দিতেন। নিত্যপণ্য, স্টেশনারি, খাবার, পোশাক ও নির্মাণসামগ্রীর দোকানে হাজার হাজার টাকা বাকিতে কেনাকাটা চলত বছরজুড়ে। আবার বাংলা বছরের শুরু পহেলা বৈশাখে সেই টাকা পরিশোধ করা হতো আনন্দ উৎসবে। হালখাতা উৎসব চলত ছোট-বড় প্রতিটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। একসময় এই হালখাতা উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসবে রূপ নেয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারিতে এই উৎসবে ভাটা পড়ে। বাঙালির এ উৎসব দুই বছর ধরে পালন করতে পারছে না ঝালকাঠির মানুষ। উৎসব যেমন পালন করতে পারছে না, তেমনি ব্যবসায়ীরাও তাঁদের বকেয়া টাকা পাচ্ছেন না সময়মতো।

ঝালকাঠির অন্যতম নিত্যপণ্যের আড়ত মেসার্স খোকন লাল ব্রহ্মের মালিক খোকন লাল ব্রহ্ম বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা লাখ লাখ টাকা মানুষের সুবিধার্থে বাকি দিই। পহেলা বৈশাখে এ টাকা পরিশোধের জন্য কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ক্রেতারাও দোকানে এসে মিষ্টিমুখ করে আনন্দে টাকা পরিশোধ করে যান। কিন্তু দুই বছর ধরে করোনার কারণে আমরা হালখাতা অনুষ্ঠান করতে পারছি না। এতে বকেয়া ঠিকমতো দিচ্ছেন না অনেকেই। আবার যাঁরা একটু সচেতন, তাঁরা আগেভাগেই বকেয়া পরিশোধ করছেন।’

শহরের কাপড় ব্যবসায়ী মঞ্জুর মোর্শেদ লিটু বলেন, ‘কাপড়ের দোকানে প্রতিবছরই অনেক টাকা বকেয়া পড়ে। গ্রাহকরা চৈত্র মাসেই বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতি নেন। পহেলা বৈশাখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসেন হালখাতা উৎসবে। পরিশোধ করে যান বকেয়া। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে হালখাতা অনুষ্ঠান তো দূরের কথা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের, অন্যদিকে বকেয়া পাচ্ছি না। শুধু আমরাই না, ঝালকাঠির বেশির ভাগ ব্যবসায়ী অসুবিধার মধ্যে আছেন। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

শহরের সূর্য ভাণ্ডারের মালিক অশোক বণিক বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির আনন্দের একটি দিন। নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে এই দিনে। এর মধ্যে হালখাতা একটি বড় অনুষ্ঠান। গ্রাহকরা তাঁদের বকেয়া পরিশোধ করেন এই উৎসবে। কিন্তু করোনা আমাদের সেই উৎসব কেড়ে নিয়েছে। সরকারঘোষিত কঠোর লকডাউনের কারণে আমরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখছি। হালখাতা অনুষ্ঠান করতে না পারায় অনেকেই পুরনো বকেয়া টাকা পরিশোধ করছেন না।’