kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

শুল্ক কর ও ভ্যাটে ছাড় দাবি

করোনায় সংকটে পোল্ট্রিশিল্প

ফারজানা লাবনী ও রোকন মাহমুদ   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় সংকটে পোল্ট্রিশিল্প

করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট সংকট এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি পোল্ট্রিশিল্প। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে। ভয়ংকর এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সরকার বাধ্য হয়ে আজ সোমবার থেকে লকডাউন দিয়েছে। করোনাকালীন সংকটে পোল্ট্রি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এই খাতের সংশ্লিষ্টরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে পোল্ট্রিশিল্পে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা, স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের বিধান রহিত করা, আমদানীকৃত কাঁচামালের অগ্রিম আয়কর সকল পর্যায়ে ২ শতাংশ নির্ধারণের আবেদন করেছেন।

একই সঙ্গে এই খাতের ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার, করপোরেট কর ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, টার্নওভার ট্যাক্স প্রত্যাহারের আবেদন, পিআরটিসি ল্যাবে আমদানীকৃত কাঁচামাল পরীক্ষায় কিটের দাম কমানো, বন্দর থেকে পণ্য ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রতা দূর করা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাতিলের আবেদনের দাবি করেছেন। এনবিআরসংশ্লিষ্ট এসব সুবিধা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সভাপতি ও প্যারাগন অ্যাগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছর করোনায় ২৫ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ফলে মুরগি ও ডিমের উত্পাদন অনেক কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে এখনকার বাজারে। চাহিদার তুলনায় মুরগি উত্পাদন না থাকায় দাম বেড়েছে। গত বছর যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আরো কয়েক বছর লাগবে। যদিও সরকার খামারিদের ১০ হাজার করে টাকা দিয়েছে। কিন্তু এই সামান্য টাকায় খামারিদের ঘুরে দাঁড়ানো কোনো মতেই সম্ভব নয়।

এনবিআরে করা আবেদনে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে দেশীয় পোল্ট্রিশিল্পের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ওয়ান হেলথ পোল্ট্রি হাব বাংলাদেশের এক সমীক্ষা মতে, বিগত ১২ বছরের মধ্যে পোল্ট্রির দর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল কভিড মহামারির কারণে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) হিসাব মতে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পোল্ট্রিশিল্পে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০২০ সালের জুন মাসে করা ফলোআপ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৩০-৪৫ শতাংশ ডিওসির উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে, ৩৫-৪০ শতাংশ ফিডের উত্পাদন এবং প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস প্রডাক্টের বিক্রয় কমে গেছে।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) দেওয়া তথ্য মতে, করোনার প্রভাবে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা (ডিওসি), হ্যাচিং ডিম, এমনকি ইনকিউবেশনে থাকা ডিমও ধ্বংস করতে বাধ্য হয়েছে ব্রিডার ফার্মগুলোকে। ৩৫-৪০ টাকা খরচে উত্পাদিত প্রতিটি ডিওসি পাঁচ টাকারও কমে বিক্রি করতে হয়েছে, তাও বাকিতে। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও অদ্যাবধি তা প্রান্তিক খামারিদের হাতে পৌঁছেনি।

বিএবির তথ্য মতে, করোনার প্রভাব কমে এলেও ব্রয়লার ডিওসির সাপ্তাহিক উত্পাদন এক কোটি ৭০ লাখ থেকে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখে নেমে এসেছে। সোনালী ডিওসির উত্পাদনও ২০-২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে কাঁচামাল পরিবহনে কনটেইনার ও জাহাজ ভাড়াও প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় কভিডের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে; সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের উত্পাদন নিশ্চিত করতে এবং রপ্তানির স্বার্থে আমাদের দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি কর কাঠামো এবং সেই সঙ্গে আগামী ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা প্রয়োজন।

আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তর থেকে কাঁচামাল (যেমন : ভুট্টা, চালের কুঁড়া বা রাইস ব্রান) সংগ্রহের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা এর আগের অর্থবছরে ছিল না। খামারিদের যেহেতু কোনো ই-টিআইএন সার্টিফিকেট নেই, তাই বিধি মেনে কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। যদি উৎসে কর কর্তন করাও হয় তবুও তা জমা দেওয়ার যেহেতু কোনো উপায় নেই তাই তৃণমূল খামারিদের কথা বিবেচনায় নিয়ে উল্লিখিত বিধানটি রহিত করা প্রয়োজন।

এনবিআরের আবেদনে আমদানীকৃত কাঁচামালের অগ্রিম আয়কর সকল পর্যায়ে ২ শতাংশ নির্ধারণের আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে, কাস্টমস ট্যারিফ অনুযায়ী ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত আমদানীকৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রে ভুট্টা ছাড়া অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ হারে এআইটি প্রদানের বিধান রয়েছে। যেহেতু ফিড ইন্ডাস্ট্রি বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকে তাই ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এআইটির হার কমানোর আবেদন জানালে রাজস্ব বোর্ড ক্ষেত্রবিশেষে তা কমিয়ে থাকে। আরোপিত এই হার সব ক্ষেত্রে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

এনবিআর করনীতি শাখার সদস্য আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দেশে পোল্ট্রি সম্ভাবনাময় শিল্প। করোনায় এই শিল্পে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আগামী বাজেটে এই শিল্পের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।