kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে জমানো টাকার লাভ

জিয়াদুল ইসলাম   

১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে জমানো টাকার লাভ

রাজধানীর গুলবাগের বাসিন্দা আফরোজা বেগম। গত মাসে মৌচাকে বেসরকারি একটি ব্যাংকের শাখায় দুই লাখ টাকা এফডিআর (স্থায়ী আমানত) করার জন্য যান, কিন্তু শাখাটি থেকে তাঁকে যে মুনাফার অফার দেওয়া হয়, ওই মুনাফায় টাকা রাখতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর তিনি নিকটাত্মীয়ের পরামর্শে ওই টাকা দিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু টিআইএন সার্টিফিকেট না থাকায় এক লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে সক্ষম হন।

জানা যায়, ওই শাখাটি প্রতি লাখে বার্ষিক মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ হারে মুনাফার প্রস্তাব করেছিল আফরোজা বেগমকে। এ বিষয়ে আফরোজা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জানতাম সঞ্চয়পত্রে কিনতে অনেক কাগজপত্র জমা দিতে হয়। তাই আমি ব্যাংকে টাকা রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমানতের সুদ এত কমেছে, সেটি জানতাম না। পরে আমি নিকটাত্মীয়ের পরামর্শে এক লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছি।’ আফরোজা বেগমের মতো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অনেকেই সঞ্চয়পত্রে কড়াকড়ি ও আমানতের সুদ কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত মার্চ মাসে ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর গ্রাহকদের বার্ষিক গড়ে সাড়ে ৪ শতাংশেরও কম মুনাফা দিয়েছে। এর থেকে কাটা হবে সরকারের উেস কর, আবগারি শুল্কসহ নানা চার্জ। ফলে এখন টাকা ব্যাংকে রাখলে মুনাফা পকেটে ঢোকা দূরের কথা, মূল টাকাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। কারণ এখন মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতের সুদ পতন ঠেকানো না গেলে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কারণ বিভিন্ন শর্ত পরিপালন করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর পক্ষে সঞ্চয়পত্র কেনাও সম্ভব নয়। ফলে সঞ্চয় চলে যেতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমানতের সুদ ৬ শতাংশের নিচে নামিয়ে দেওয়া মোটেও যুক্তিসংগত হচ্ছে না। কারণ সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে মুনাফার আশায়। অনেকের সংসার চলে এ মুনাফার টাকায়, কিন্তু ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমার অজুহাতে প্রতি মাসেই আমানতে সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। আবার আমানতের মুনাফায় উেস কর ও আসলে ওপর আবগারি শুল্ক কাটা হচ্ছে। এতে সাধারণ আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, করোনার মধ্যেও মানুষের সঞ্চয়প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। তাই এটা ধরে রাখতে আমানতের সুদের হার কিছুটা বাড়াতে হবে। তা না হলে আগামীতে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস কমে যাবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঋণের সুদ ৯ শতাংশ কার্যকরের কারণেই আমানতের সুদ কমিয়ে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু যে কারণে ঋণের সুদ কমানো হলো, সেই বেসরকারি বিনিয়োগ কিন্তু বাড়েনি, কিন্তু আমানতের সুদ ঠিকই কমে গেছে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় এই সুদ হার অনেক কম।’ এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োগ অনুৎপাদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনতে ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণে ৯ শতাংশ সুদ বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের পাশাপাশি সরকারি আমানতের সুদও ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তবে ব্যক্তি আমানতের সুদ নির্ধারণের ক্ষমতা রাখা হয়েছে ব্যাংকগুলোর হাতেই, কিন্তু ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়নের স্বার্থে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই ব্যক্তি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। এরপর সব ব্যাংকই তাদের আমানতের সুদ কমাতে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে আমানতের গড় সুদহার নেমে এসেছে ৪.৩৫ শতাংশে। এক বছরের আগে ২০২০ সালের মার্চে যা ছিল ৫.৫১ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আমানতের সুদ কমেছে ১.১৬ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ১০০ টাকার পণ্য ও সেবা কিনতে ভোক্তাকে ব্যয় করতে হয়েছে ১০৫ টাকা ৩২ পয়সা। বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আরো বেশি। ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৫.৪২ শতাংশ। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি শেষে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই হার মার্চে আরো ঊর্ধ্বমুখী ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।