kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

বীমায় বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা সংকট

এ এস এম সাদ   

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বীমায় বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা সংকট

ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মতো দেশের অর্থনীতির আরেকটি স্তম্ভ বীমা। অথচ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নিয়ে জনমনে যতটা আগ্রহ ও আস্থা, এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে বীমা খাত। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ নেই, আস্থার সংকটও প্রকট। অথচ একটি দেশের পুরো আর্থিক খাতকে সচল রাখতে সহায়তা করে বীমা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত বীমা। সেখানে প্রতিটি কার্যক্রম হয় বীমাকেন্দ্রিক। ফলে সেসব দেশের জনগণের রয়েছে আর্থিক নিশ্চয়তা। কিন্তু বহু যুগ আগে থেকে এই অঞ্চলে বীমার কার্যক্রম শুরু হলেও অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান একেবারে সামান্য। সাধারণ মানুষের আস্থা না থাকাই এই সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাই বীমা বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি আস্থা তৈরির লক্ষ্যে গত বছর ১ মার্চ থেকে পালন করা হচ্ছে বীমা দিবস। দিবসটি পালন করার উদ্যোগ নেয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এবারও ১ মার্চ (আজ) দিবসটি পালন করার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ নিয়ে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেন এফসিএ বলেন, ‘বীমার ওপর গণমানুষের আগ্রহ তৈরি করার জন্যই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এখনো সবাই জীবন বীমা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। তাই বীমার সুফল সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে হবে। বীমার ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। তবে আমাদের আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ের আওতায় বীমা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশে দুই কোটি মানুষ বীমার আওতায় রয়েছে। আরো ১০ কোটি মানুষকে বীমার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সবার জীবন বীমা করা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইডিআরএ গঠিত হয়েছে ১০ বছর হলো। কিন্তু বীমা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের মতো অভিযোগ আইডিআরএ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়নি। বরং আইডিআরএর শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু বীমা কম্পানিগুলোকে দোষারোপ না করে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকেও সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাস্থ্য বীমার সঠিক ব্যবহার নেই। অধিকাংশ জনগণের এটি বাধ্যতামূলক করা উচিত। আমি মনে করি, সরকারের স্বাস্থ্য খাতের দিকে নজর দেওয়া উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাধারণ বীমার আওতায় আনতে হবে। বীমা কর্তৃপক্ষের এই পলিসি বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারণ দেশের কারখানায় অনেক সময় অগ্নিসংযোগের মতো দুর্ঘটনা ঘটে। কৃষি খাতে বীমার গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রায় প্রতিটা জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে। তাদের জনবলের ঘাটতি রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে এই ভঙ্গুর খাতকে উন্নত করা সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আইডিআরএ হওয়ার পর দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে বীমা দিবস পালনের মাধ্যমে সবার মধ্যে এটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হবে। আইডিআরএ যদি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

তবে বীমা খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনো খাতের উন্নতির জন্য একটি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স সমপর্যায়ে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স ডিগ্রি রয়েছে। তবে এই ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ইনস্যুরেন্সকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে ইচ্ছুক নন। কারণ হিসেবে একাধিক শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেন, কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, কমিশনভিত্তিক বেতন, আস্থার সংকট, বিরূপ ধারণা—এগুলোর জন্যই মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় সংযুক্ত হতে আগ্রহী নন।

উন্নত দেশগুলোতে বীমা আর্থিক খাতে সরাসরি অবদান রাখে। সেসব দেশের নাগরিকদের বাধ্যতামূলক ইনস্যুরেন্স করতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, উন্নত দেশে আর্থিক খাতে বীমার অবদান ৯.৬ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে তা ০.৫৭ শতাংশ। আইডিআরএ জানাচ্ছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ জনগণ বীমার আওতায় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পরিমাণ ৮ শতাংশের বেশি নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মুজাহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইডিআরএর বীমা নিয়ে গবেষণা করা দরকার। দেশের কত মানুষ এখন বীমার আওতায় আছে এর সঠিক পরিসংখ্যান দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত তাদের তথ্য সরবরাহ করে। আইডিআরএর পক্ষ থেকেও এ রকম পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাহলে বীমা নিয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা জনমনে তৈরি হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শস্য বীমা বাধ্যতামূলক করা হলে কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’

মন্তব্য