kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

ওকাপের জরিপ

বিদেশে গিয়ে সফলতা পাননি ৬০% শ্রমিক

এ এস এম সাদ   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিদেশে গিয়ে সফলতা পাননি ৬০% শ্রমিক

ইউনুস প্রামাণিক, বয়স ৪১। আড়াই লাখ টাকা খরচ করে ২০১৭ সালে রিক্রুুটিং এজেন্সি এমএস টাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে নির্মাণ শ্রমিক ভিসায় ওমান গিয়েছিলেন। তাঁকে যেতে হয় দালালের মাধ্যমে। একটি কম্পানিতে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হলেও ওমানে যাওয়ার পর আশ্বাস মোতাবেক চাকরি পাননি।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি ওই দালালের মাধ্যমে ১৮ হাজার টাকা বেতনের একটি কাজ পেয়েছিলেন ইউনুস। কিছুদিন পর দালাল ওমান ছেড়ে চলে গেলে ইউনুসের চাকরিটাও চলে যায়। পরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে আট হাজার টাকা বেতনের একটি কাজ পান তিনি। কিন্তু কাজ করার সময় দোতলা থেকে পড়ে ইউনুসের পায়ের গোড়ালি ভেঙে যায়। ওমানের পুলিশ তাঁর ব্যাপারে অবগত হলে সে দেশেই তাঁর ভিসা ও পাসপোর্ট ব্লক করে দেয়। আইন অনুযায়ী ওমানে জেল হয় ইউনুসের। এরপর নিজ টাকায় দেশে ফিরে আসেন। ইউনুস বলেন, ‘দালালের মাধ্যমে আমি প্রতারিত হয়েছি।’

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রগ্রাম (ওকাপ) ২০১৯ সালে ২৫০ জন দেশে ফেরত আসা শ্রমিকের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ শ্রমিক বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে গিয়ে সফল হননি। এসব শ্রমিক নিজ ও পরিবারের জায়গা-জমি বিক্রি করে বেশি বেতনে চাকরি পাওয়ার আশায় মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে পাড়ি দেন। কিন্তু স্থানীয় দালাল ও রিক্রুট এজেন্সির মাধ্যমে তাঁদের বেশির ভাগই প্রতারিত হন। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ দাবি করেছেন, প্রবাসে যাওয়ার পর তাঁদের যে চাকরি ও বেতন দেওয়ার কথা তা দেওয়া হয়নি। এজেন্ট ও রিক্রুট এজেন্সি বেশি বেতনের চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর কম বেতনের চাকরি করতে বাধ্য করা হয়। জরিপে আরো উঠে আসে, অসফল প্রাবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিনা বেতনেই সেখানে কাজ করেছেন, যাঁদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ শতাংশ নারী। আর ১০ শতাংশ শ্রমিকের ওপর সেখানে নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

জরিপে আরো উঠে আসে, প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক প্রবাসে সফল; যার মধ্যে ২৯ শতাংশ ফেরত আসা শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া তাঁরা জায়গা-জমি কিনতে সক্ষম হয়েছেন এবং সন্তানদের স্কুলের শিক্ষা দেওয়ার মতো আর্থিক সচ্ছলতাও বেড়েছে। অন্যদিকে পরিবার ও নিজেদের উন্নত চিকিৎসা দিতেও সক্ষম হচ্ছেন। ফেরত আসা ৩৫ শতাংশ আয় সঞ্চয় করে নতুন করে জীবিকা শুরু করেছেন এবং ৩৬ শতাংশ মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিকের কাজে দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেদের তৈরি করেছেন।

ফেরত আসা শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ নিজেদের অবস্থা সচ্ছল করতে সক্ষম হয়েছেন। ৪ শতাংশ চাকরি জোগাড় করেছেন, ৪০ শতাংশ বেকার ও ২৩ শতাংশ পুনরায় শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিক্রুট কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। কারণ আইন অনুযায়ী শুধু লাইসেন্সধারী এজেন্সি রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকতে পারবে। বাস্তবতা হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের সাব-এজেন্ট তৈরি করা হয়, পরবর্তী রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির সঙ্গে এরা কাজ করছে। এ কারণে অনেক সময় মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। ফলে দেখা যায় শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে নানা রকমের সমস্যার মধ্যে পড়ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অভিবাসী আইন ২০১৩-তে পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ যাঁরা মাঠ পর্যায়ে সাব-এজেন্ট কিংবা এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের নিবন্ধনের মধ্যে এনে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে যাঁরা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ এই সাব-এজেন্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বেশি নজির নেই।’

রামরুর অভিবাসী বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক ড. জালাল উদ্দিন শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাইরের দেশে তুলনামূলকভাবে শ্রমিকের চাহিদা কম। দেশে চাকরির অপ্রতুলতার কারণে বিদেশে কাজ করতে যেতে হয়। যেহেতু দেশ দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে না, সেহেতু অদক্ষ শ্রমিকরা এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাইরের দেশে অভিবাসী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হলে বাংলাদেশের প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে না; কারণ সেই সব দেশ থেকে শ্রমিক রিক্রুট করা বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। আর অন্যদিকে রিক্রুটিং এজেন্সি সঠিকভাবে চুক্তিগুলো শ্রমিকদের বোঝাতে সক্ষম হয় না। কারণ চুক্তিগুলো ইংরেজি ও অ্যারাবিক ভাষায় লেখা থাকে।’

মন্তব্য