kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বদলে গেছে শাওইলের তাঁতশিল্প

ছোট উদ্যোক্তাদের চোখে বড় স্বপ্ন

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ছোট উদ্যোক্তাদের চোখে বড় স্বপ্ন

মাত্র ছয় বছর আগের কথা। তখনো বগুড়ার আদমদীঘির শাওইল এলাকার তাঁতি সম্প্রদায়ের লোকেরা খটখটি বা গর্ত তাঁতে মশারি ও গামছা তৈরি করত। সে মশারি ও গামছাগুলো পাইকারিভাবে শাওইল ও সান্তাহার হাটে প্রতি সপ্তাহে বিক্রি করা হতো। রাত-দিন সমান করে পরিশ্রমের পরেও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হতো তাদের পণ্য। তবে পরিবর্তন এসেছে এখন এই অঞ্চলের হাজার হাজার তাঁতির ভাগ্যে। দরিদ্র তাঁতিদের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে এসেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এখন হস্তচালিত খটখটি বা গর্ত তাঁতের পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুত্চালিত তাঁত। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে তাদের উৎপাদিত পণ্যেও। এখন শাওইল হাটে গামছা বা মশারি পাইকারিভাবে বিক্রি হয় না। সেখানে গামছা-মশারির পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে শাল-চাদর, কম্বল ও সুতার দড়ি। এই হাট প্রতি সপ্তাহে দুবার বসে। রবি ও বুধবার।

এই অঞ্চলে শাল-চাদরের প্রচলন হয়েছে নব্বই দশকের শেষ দিকে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই শাল-চাদরের আবির্ভাব ঘটে। এর পেছনে কাজ করে সোয়েটার বা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত সুতা। শাল-চাদর তৈরির প্রধান উপাদান বা কাঁচামাল সোয়েটার ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত উলের সুতা। শাওইল হাটে গড়ে উঠেছে এ রকম ঝুট থেকে বাছাইকৃত উলের সুতার একমাত্র বাজার। বাংলাদেশের যে যে অঞ্চলে উলের শাল-চাদর, মাফলার, কম্বল, সুতার দড়ি তৈরি হয় সেখানকার তাঁতিরা এই শাওইল হাট থেকে উলের সুতা ক্রয় করে নিয়ে যায়।

তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ উলের শাল-চাদর, কেউ গামছা আবার কেউবা কম্বল তৈরি করত। আর এসব তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আদমদীঘি উপজেলার নসরত্পুর ইউনিয়নের শাওইল বাজারে পাওয়া যেত। কিন্তু তাঁতিদের পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া ছিল সনাতন পদ্ধতির। সেখানে ছিল না আধুনিক পদ্ধতির কোনো বিদ্যুত্চালিত তাঁত এবং প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়া। তৈরীকৃত শাল-চাদরের গুণগত মানও ভালো ছিল না। এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও তাঁতিদের মতে, এই খাতে ২০০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভারের মধ্যে সুতার মার্কেটই ১২০ কোটি টাকার এবং উষ্ণ পোশাকের মার্কেট ৮০ কোটি টাকার। তবে অনেক ব্যবসায়ীর দাবি, তাঁদের এই বাজারের বার্ষিক টার্নওভার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সমস্যা : দেশের উত্তরাঞ্চলে ডায়িং মেশিন না থাকায় শাওইল বাজারে ব্যবহার করা সুতাগুলো রং করার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী বা টাঙ্গাইল পাঠাতে হয়। এতে এক কেজি সুতা রং করতে ৪০ থেকে ৫৫ টাকার মতো ব্যয় করতে হয়।

এদিকে তাঁতি সমবায় সমিতির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেনের মতে, মহাসড়ক থেকে তাঁদের হাটে পৌঁছানোর চার কিলোমিটার রাস্তা সরু এবং ভাঙা। মালপত্র আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাকগুলো যাতায়াত করতে পারে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ছয় বছর আগে এসএমই ফাউন্ডেশন এই অঞ্চলটিকে একটি সম্ভাব্য শিল্প গ্রুপ হিসেবে বেছে নেয়। ২০১৪ সালে এখানকার তাঁতিদের তারা প্রশিক্ষণ দেয়। একই সঙ্গে শাওইল বাজারের ১০৭ ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টিং, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজাইন, ডায়িং, রপ্তানি-আমদানি নীতি, বিপণন ও নেতৃত্বের বিষয়ে ১৩টি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব তহবিল থেকে এখানকার তাঁতিদের প্রায় ছয় কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। এ বছর সরকার এসএমই ফাউন্ডেশনকে সারা দেশে ১৭৭টি নির্বাচিত ক্লাস্টারের মধ্যে বিতরণের জন্য আরো ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। শাওইল বাজারের তাঁতিদের মাঝে এ ব্যাপারে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।’ তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলে তাদের পক্ষে এটি চালানো কষ্টদায়ক হবে। কারণ সুদের এই হার অন্যান্য ব্যাংকের সমান। তাই কিছুটা হলেও এই হার কমানো প্রয়োজন।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক তাঁতির সঙ্গে কথা বলে কিছু সুপারিশও মিলেছে। তাদের মতে, প্রকল্প এলাকায় আরো ডিজাইনার ও মেকানিক তৈরি করা প্রয়োজন। ভালো মানের সুতা ব্যবহার করে উন্নত ডিজাইনের শাল তৈরি করা দরকার। সারা বছর যাতে শাল-চাদর বিক্রি হয় সে জন্য দেশে-বিদেশে বাজার সংযোগের ব্যবস্থা নেওয়া। এককালীন পরিশোধে বছরব্যাপী ঋণের ব্যবস্থা করা। কাঁচামালের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।

সফল ডিজাইনার রোস্তম আলী : শাওইল গ্রামের মৃত মনসুর আলীর ছেলে রোস্তম আলীর পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে তাঁত পেশায় হাতেখড়ি। রোস্তম আলী যখন ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়েন তখন তাঁর পরিবারের লোকদের কাছ থেকে চিত্তরঞ্জন তাঁতে সুতার মশারি, গামছা বুনতে শেখেন। ১৯৯৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। এমন সময় শাওইল এলাকায় সোয়েটার ফ্যাক্টরির পরিত্যক্ত ঝুট থেকে চাদর-শাল তৈরির আবির্ভাব ঘটে। অন্যদের দেখাদেখি রোস্তম আলীও চাদর বানাতে শুরু করেন। তাঁত পেশায় তাঁর সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। বাড়িতে যেখানে থাকার মতো ঘর ছিল না সেখানে চার রুমের বারান্দাওয়ালা একটি আধা-পাকা ঘর করেছেন। দুটি ছেলে-মেয়ে মাদরাসায় লেখাপড়া করছে। রোস্তম আলী অন্য আর দশজন তাঁতির মতো হস্তচালিত তাঁতে প্লেন চাদর তৈরি করতেন। এখন তিনি বিদ্যুত্চালিত পাওয়ারলুমে জ্যাকেটের মাধ্যমে নকশাখচিত শাল তৈরি করতে পারেন। নিজের বাড়িতেই পাওয়ারলুমের আনুষঙ্গিক উপকরণ ব্যবহারের জন্য পাওয়ারলুম ন্যাকড়া কাঁড়ানোর ড্রাম, খাঁচা, নলি-ববিন ভরনের ইলেকট্রিক চরকা, ন্যাকড়া প্যাঁচানোর স্ট্যান্ড, ফিতাসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ স্থাপন করেছেন। সেখানে রোস্তম আলী এসব উপকরণ ব্যবহার করে বিদ্যুত্চালিত পাওয়ারলুমে নকশাখচিত শাল উৎপাদন করছেন। এতে তাঁর একদিকে যেমন সময় কম লাগছে, অন্যদিকে উৎপাদনও বেড়েছে।