kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নানা ছাড়ে খেলাপি ঋণে লাগাম

জিয়াদুল ইসলাম   

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নানা ছাড়ে খেলাপি ঋণে লাগাম

নানা রকম সুবিধা ও ছাড়ে খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম টানা গেছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ কমেছে। আগের তিন মাসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মতো খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। এ সময়ে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি সব খাতের ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মহামারি করোনার কারণে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছাড় দেওয়ায় নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। এ সময়ে কিছু কিছু ঋণ আদায় হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ পুনঃ তফসিল নীতিমালার আওতায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরের জন্য ঋণ পরিশোধের সুবিধায় আগের খেলাপি ঋণ ও এখন খেলাপি হতো এমন অনেক ঋণ নিয়মিত হয়েছে। সব মিলে কমেছে খেলাপি ঋণ।

খেলাপি ঋণ কমার এই তথ্য প্রকৃত নয়, কাগজে-কলমে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। তিনি সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে যেসব খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে সেটা আসলে রিয়েল না। এটাকে আমরা বলি কার্পেটের তলায় ফাঁকা। আরেকটা হলো ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন করে ঋণ খেলাপি করতে নিষেধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নিষেধের কারণে নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হচ্ছে না। এটাও জোর করে করা হয়েছে। কাজেই খেলাপি ঋণের কমার যে ফিগার, সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

তাহলে করণীয় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমাদের করণীয় কিছু নেই। করণীয় যা কিছু তার সব তো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই তো লুকিয়া রাখার পক্ষপাতী। তারাই তো ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ খেলাপি করতে মানা করে দিয়েছে। যারা তদারককারী তারাই যদি এগুলো করে তাহলে কারো কিছু বলার আছে বলে মনে হয় না। তবে যারা ডিপোজিটর সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নিয়ে তিন মাস পর পর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেপ্টেম্বর-২০২০ ভিত্তিক প্রতিবেদন গতকাল সোমবার চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, চলতি ২০২০ সালের জুন মাস শেষে দেশের ৫৯টি ব্যাংক মোট ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮.৮৮ শতাংশ। তিন মাস আগে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.১৬ শতাংশ ছিল। ফলে গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় এক হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। তার আগের প্রান্তিক গত মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা বা ৯.০৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো, সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, কভিড-১৯ মহামারির কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়ায় নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। এ ছাড়া ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে খেলাপি ঋণ পরিশোধের যে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটাও খেলাপি ঋণ কমাতে সহায়ক হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা এক লাখ ৯০ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা ২০.৮১ শতাংশ। জুন শেষে যা ছিল ৪২ হাজার ৯৩৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বা ২২.৭৩ শতাংশ। এ সময়ে বেসরকারি ৪১টি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা আট লাখ ৯ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বা ৫.৩৬ শতাংশ। আগের প্রান্তিক জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বা ৫.৮৬ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৩৪ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ দুই হাজার ৪৮ কোটি টাকা বা ৫.৮৬ শতাংশ। গত জুন শেষে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৩ কোটি টাকা বা ৫.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি ব্যাংকগুলোর পরিমাণের দিক থেকে খেলাপি ঋণ কমলেও শতকরা হিসাবে বেড়েছে। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশেষায়িত খাতের তিন ব্যাংকের বিতরণ করা ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে চার হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ১৫.৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে জুন পর্যন্ত এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল জার হাজার ৫২১ কোটি টাকা বা ১৫.৯২ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ২০১৯ সালের ১৬ মে ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিটসংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়। এই সার্কুলারের আওতায় যেসব ঋণ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর মন্দমানে শ্রেণীকৃত রয়েছে সেসব খেলাপির অনুকূলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পুনঃ তফসিল এবং ৩৬০ দিন মেয়াদে এককালীন এক্সিট সুবিধা প্রদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। চলতি ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল ছিল। এই সুবিধার আওতায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকার মতো পুনঃ তফসিল হয়েছে। ১৩ হাজার ৩০৭ জন গ্রাহক এই সুবিধা নিয়েছেন। এ ছাড়া বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় এ সময় বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে শুরু হয় মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ। এই সংকটকালে ঋণের কিস্তি শোধে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই ছাড় মোতাবেক ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি না দিলেও কোনো ঋণ নতুন করে খেলাপি করা যাবে না।

মন্তব্য