kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাফল্য

গুঁড়া পেঁয়াজের গুণমান থাকবে দুই বছর

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গুঁড়া পেঁয়াজের গুণমান থাকবে দুই বছর

মাঠ থেকে সংগ্রহের পর খাদ্যে ব্যবহারের আগে নষ্ট হয় অন্তত ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ। তবে এখন আর পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না। কাঁচা পেঁয়াজের গুঁড়া (পাউডার) তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বগুড়ার শিবগঞ্জের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের কৃষিবিজ্ঞানী ড. মাসুদ আলম। প্রাথমিকভাবে তাঁর উদ্ভাবিত এই গুঁড়া পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে গুণ ও মান শতভাগ ঠিক থাকছে। পেঁয়াজের এই গুঁড়া এখন বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানান এই বিজ্ঞানী।

ড. মাসুদ আলম বলেন, ‘চার-পাঁচজনের একটি পরিবারে মাসে গড়ে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে একটি পরিবারে বছরে পেঁয়াজ প্রয়োজন ৬০ কেজি। বছরে ৬০ কেজি পেঁয়াজ যে পরিবারের চাহিদা, তাদের কিনতে হয় অন্তত ৮০ কজি। কারণ পেঁয়াজ কেনার পর ব্যবহারের আগে কিছু অংশ পচে যায়। কিন্তু এই পেঁয়াজ পাউডার করে রাখলে আর পচার শঙ্কা নেই। পাউডার অবস্থায় ভালোভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তার গুণমান বজায় থাকবে দুই বছর। পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণে গুঁড়া করলে এর গুণগত মান, খাদ্যে ব্যবহারের পরিমাণ কোনোটাই কমে না। এক কেজি পেঁয়াজ শুকিয়ে পাউডার পাওয়া যায় ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম। এক কেজি মাংস রান্না করতে সাধারণত কাঁচা পেঁয়াজ লাগে ২৫০ গ্রাম। ২৫০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজ গুঁড়া করলে পাওয়া যাবে ২৫ গ্রাম। এক কেজি মাংস রান্নায় ওই ২৫ গ্রাম গুঁড়া ব্যবহার করলে ২৫০ গ্রাম কাঁচা পেয়াজের ফল পাওয়া যাবে। এতে খরচও বেশি পড়বে না।’ 

পেঁয়াজের পাউডার প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে ২০০৯ সাল থেকে কাজ করছেন ড. মাসুদ আলম। এ গবেষণার সফলতা পেতে সময় লেগেছে পাঁচ বছর। এর পরও প্রায় সাত বছর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে পেঁয়াজের পাউডার বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কাঁচা পেয়াজের চেয়ে পেঁয়াজের পাউডার সাশ্রয়ী এবং সংরক্ষণ করা যায় দীর্ঘদিন। এর ফলে পেঁয়াজ আমদানির ওপর চাপ কমবে। পেঁয়াজের বাজারও স্থিতিশীল হবে। আর পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাত করে পাউডার করা গেলে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ আর নষ্ট হবে না।

পেঁয়াজের পাউডার সূর্যের তাপ আর যান্ত্রিক পদ্ধতি দুইভাবেই করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন পেঁয়াজ কাটার যন্ত্র, প্লাস্টিকের পাত্র, লবণ, সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড, ড্রায়ার মেশিন ও পলি ব্যাগ। প্রথমে পেঁয়াজ সংগ্রহ করে বাছাই করে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। পরে সেগুলো মেশিনে স্লাইস করে কেটে ভাপ দিতে হবে। এরপর সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড দ্রবণে ডুবিয়ে রাখতে হবে। পরের ধাপে এই পেঁয়াজ শুকাতে হবে। শুকানো পেঁয়াজ গুঁড়া করলেই কাজ শেষ। এরপর মোড়কে ভরে সংরক্ষণ করতে হবে। যান্ত্রিকভাবে শুকিয়ে পেঁয়াজের গুঁড়া তৈরি করতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা। আর প্রাকৃতিকভাবে করলে কয়েক দিন। ঘরে বসেই তৈরি করা যায় পেঁয়াজের পাউডার।

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন। বাকিটা আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজের পাউডার বাজারজাত করা গেলে আমদানি কমবে। জাপান, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত করা মসলা ব্যবহার করা হয়। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসে দেশে পেঁয়াজের পাউডারের বাজার তৈরি করলে বিপুল আয়ের নতুন পথ খুলবে।

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামীম রেজা বলেন, ‘দেশে সব ধরনের মসলাতেই আমরা আমদানিনির্ভর। আমরা যত বেশি চাষ এবং প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হব, তত আমাদের লাভ। ড. মাসুদ পেঁয়াজ গুঁড়ার যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, তা যুগান্তকারী। এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা গেলে পেঁয়াজ আমদানির দৌরাত্ম্য কমবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোনো উদ্যোক্তা যদি এগিয়ে আসতে চান, তবে আমাদের সঙ্গে সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) করতে হবে। কারণ এ গবেষণা রাষ্ট্রের। এমওইউ থাকলে আমরা তাঁদের দিকনির্দেশনা দিতে পারব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা