kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

যোগ্য নেতৃত্বে সাফল্য আসছে

করোনা সংকটেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক

শামস-উল ইসলামের স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু কর্নার ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে
রেমিট্যান্স আহরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে

১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা সংকটেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক

বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান-এর কাছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তিনটি বই, একটি ছবির অ্যালবাম ও একটি স্মরণিকা হস্তান্তর করেন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. শামস-উল ইসলাম। ছবি : কালের কণ্ঠ

আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে করোনা দুর্যোগের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকিংসেবা দিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অফিসের পাশাপাশি বাসা থেকে পুরোদমে কাজ করছেন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের কর্মী। এতে সংকটের মধ্যেও ব্যাংকটির ব্যবসার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭০-৮০ শতাংশ। পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের ভিত অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় অনেকটাই মজবুত। এই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখতের যথাযথ দিকনির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালক (এমডি) মো. শামস-উল ইসলামের দক্ষ নেতৃত্বে ক্রমেই উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে ব্যাংকটি।

২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দেন শামস-উল ইসলাম। এমডির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি অগোছালো অগ্রণী ব্যাংককে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়েছেন। যখন দায়িত্ব নেন, তখন ব্যাংকের সব ব্যাবসায়িক সূচক ছিল নিম্নগামী। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে ব্যাংকের সব ব্যাবসায়িক সূচকে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটাতে সক্ষম হন। এর পর থেকে ক্রমেই উন্নতির দিকে যাচ্ছে ব্যাংকটি। সন্তোষজনক পারফরম্যান্সের কারণে এক মেয়াদ শেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব পান এই এমডি। করপোরেট আবহে বঙ্গবন্ধু কর্নারের স্বপ্নদ্রষ্টা এই ব্যাংকার বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা থেকে ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মৌলভীবাজারের আঞ্চলিক কার্যালয়ে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু কর্নার প্রতিষ্ঠা করেন। পরে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং সর্বশেষ অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ষষ্ঠ তলায় জাতির জনকের ম্যুরালসহ পূর্ণাঙ্গ অবয়বে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন করেছেন। এখন দেশের করপোরেট অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপিত হয়েছে।

কয়েক বছর ধরেই রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের অগ্রগতি সন্তোষজনক। মহামারি করোনার মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটি ৫৩১ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে, যা গত বছরের একই সময় ছিল ৩১৯ কোটি টাকা। রেমিট্যান্স আহরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে এবং দেশের সব ব্যাংকের মধ্যে দ্বিতীয়। দ্রুত কমছে খেলাপি ঋণ ও লোকসানি শাখা। আমানত ও ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। স্বপ্নের পদ্মা সেতু, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে ব্যাংকটি। এমনকি করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণেও এগিয়ে রয়েছে ব্যাংকটি। দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে যথাযথ ভূমিকা রেখে চলছে অগ্রণী ব্যাংক।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংকের নাম দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাবিব ব্যাংক এবং কমার্স ব্যাংক একত্র করে এই ব্যাংকের নামকরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হয়তো প্রত্যাশা ছিল ব্যাংকটি অগ্রে থাকবে। আমি মনে করি জাতির পিতার দেওয়া নামের সার্থকতা আমরা এরই মধ্যে প্রমাণ করতে পেরেছি। আমরা এখন অগ্রে রয়েছি। করোনার মধ্যেও চলতি বছরের ছয় মাসে ৫৩১ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছি।’

ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা ও করোনার কারণে বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমেছে, সেখানে অগ্রণী ব্যাংকের কিভাবে এত বেশি মুনাফা করা সম্ভব হলো জানতে চাইলে শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কয়েকটা ক্ষেত্রে কাজ করেছি একসঙ্গে। বিশেষ করে যখন দেখেছি যে আমাদের সুদের হার কমিয়ে দিতে হবে, তখন কিন্তু আমরা বিকল্প যতগুলো রাস্তা আছে আয় বাড়ানোর সবগুলোতে আমরা হাত দিয়েছি। আমরা খরচ কমিয়ে আয় বাড়িয়েছি।’ তিনি বলেন, দেশের ১৬ কোটি জনগণ আমাদের ব্যাংকের মালিক। তাই মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায়বদ্ধতা থেকে ৩৬টির মতো সেবা বিনা চার্জে দিচ্ছে অগ্রণী ব্যাংক। কারণ মুনাফা করাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তবে আমরা যেহেতু ব্যাংক, তাই অর্থনৈতিক মুনাফা যেমন করতে হবে, তেমনি সামাজিক মুনাফাও করতে হবে।

মানবিক ব্যাংকার হিসেবেও অতুলনীয় শামস-উল ইসলাম। করোনার মধ্যেও অগ্রণী ব্যাংকে কর্মরত প্রায় ১৩ হাজার কর্মীর সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন তিনি। কোথাও কেউ করোনা আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। ব্যাংকের সামগ্রিক বিষয়ে সশরীরে ব্যাংকে এসে কিংবা বাসা থেকেই তদারকি করছেন।  তিনি বলেন, ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংক এককভাবে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করেছে। এটা আমাদের একটা বড় অর্জন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ থেকে ২ শতাংশ বেড়ে যাবে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১৪টি পাওয়ার প্লান্ট অগ্রণী ব্যাংক অর্থায়ন করেছে। এসব পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। এতে বিরামহীন বিদ্যুৎ পাচ্ছে দেশের মানুষ। যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারেও আমরা অর্থায়ন করেছি। আমরা নীরবে-নিভৃতে এ কাজগুলো করছি, যা অনেকেই জানে না।’

বঙ্গবন্ধু কর্নার করার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাত বছর আমি দেশের বাইরে ব্যাংকিং করেছি। ক্যারিয়ারের ১৬ বছর কাটিয়েছি চট্টগ্রামে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি আমি জিএম পদোন্নতি পেয়ে প্রধান কার্যালয়ে আসি। সে সময় আমাকে হেড অব আইডি করা হয়। একই সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। জিএম পদটি দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে একটি সম্মানজনক পদ হিসেবেই স্বীকৃত। সিলেট যাওয়ার পর আমার মনে হলো, দেশ স্বাধীন না হলে আমি জিএম হতে পারতাম না। হয়তো হাবিব ব্যাংকের এসপিও পর্যন্ত যেতে পারতাম। যার জন্য দেশটি স্বাধীন হলো, আমি জিএম হতে পারলাম, সেই বঙ্গবন্ধুর সম্মানে কিছু করার ইচ্ছা হলো। আমি ভাবলাম জাতির পিতাকে কিভাবে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানো যায়। আমি তো কবি না যে কবিতা লিখতে পারব, আমি আর্টিস্ট না যে ছবি আঁকব বা ম্যুরাল তৈরি করব। ওই রকম লেখক না যে উনাকে নিয়ে বই লিখব। তাই আমি চিন্তা করলাম করপোরেট আবহের কোনো একটি জায়গায় বঙ্গবন্ধুর ওপর কর্নার করতে, যেখানে শুধু বঙ্গবন্ধুর ওপর বই থাকবে। এটা নিয়ে যে এত প্রচার হবে, এটা যে জাতীয় পর্যায়ে চলে যাবে তা আমি চিন্তাও করিনি। আবার অনেকে সমালোচনাও করেছে। বলেছে আপনি বঙ্গবন্ধুকে কর্নারে নিয়ে নিলেন। সরকার পরিবর্তন হলে আপনার চাকরি থাকবে না। এমন অনেক কথাই আমাকে শুনতে হয়েছিল। পরবর্তী সময় আমি যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ত্রাণ দিতে গেলাম তখন আমি পকেটে করে আনসার ডিডিপি ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকের বঙ্গবন্ধুর কর্নারের দুটি ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। উনাকে যখন দিলাম তখন তিনি অনেক সময় দেখে বললেন গুড আইডিয়া। পরবর্তী সময় দুই থেকে তিন মাস পরেই পত্রিকায় দেখলাম সরকারি নির্দেশনা এলো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে বঙ্গবন্ধুর কর্নার করতে হবে। এটা পত্রিকায় দেখার পরেই দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েছি। এত দিন আমি যা করেছি জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি উপলব্ধি করলেন যে এটি ভালো কাজ। কারণ এত দিন খুব টেনশনের মধ্যে ছিলাম কাজটা কি ভালো হলো না, খারাপ হলো। পরে আমি একটি বই ডকুমেন্টারি আকারে করেছি, এইচ টি ইমাম সাহেবকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছিলাম। এখন তো শুধু দেশে না বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনে বঙ্গবন্ধু কর্নার করা হচ্ছে।’

দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত। করোনার মধ্যেও তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন। ব্যাংকের সার্বিক বিষয়  খোঁজখবর রাখেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এই অর্থনীতিবিদের আশা করোনা সংকট কাটিয়ে দেশের অর্থনীতি শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াবে। এ বিষয়ে ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘বাংলাদেশে এ মুহূর্তে যে স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে, সেটার পিকটা আমরা অতিক্রম করতে পেরেছি। আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছি। কোনো সন্দেহ নেই একবার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি টেকসই পর্যায়ে গেলে দেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং আজকে আমাদের যাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্বে আছেন তাঁরা দূরদর্শীসম্পন্ন এবং তাঁরা যে নীতি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তাতে আগামীতে অর্থনীতি দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে যাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্মাণ খাত অর্থনীতির একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কারণ এটার সঙ্গে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের একটা লিংকেজ আছে। একটার প্রয়োজনে অন্যগুলোর চাহিদা বেড়ে যায়।’

এদিকে গত সোমবার রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত ও এমডি মো. শামস-উল ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান। এ সময় অগ্রণী ব্যাংক এবং বসুন্ধরার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাবসায়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ব্যাংকের বিভিন্ন অগ্রগতি তুলে ধরেন। এতে বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মুগ্ধ হন এবং ধন্যবান জ্ঞাপন করেন। অগ্রণী ব্যাংকের এমডি সাফওয়ান সোবহানকে তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তোলা বঙ্গবন্ধু কর্নার ঘুরে দেখান। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা তিনটি বই, একটি ছবির অ্যালবাম এবং একটি স্মরণিকা উপহার হিসেবে সাফওয়ান সোবহানের কাছে হস্তান্তর করেন। এগুলো হলো—বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, অগ্রণী ব্যাংক পরিবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা, বঙ্গবন্ধু কর্নার (অ্যালবাম ২০১০-২০১৯) এবং বঙ্গবন্ধু কর্নার (নন্দিত উদ্ভাবন)। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাফওয়ান সোবহান। এ সময় অগ্রণী ব্যাংক ও বসুন্ধরা গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা