kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

করোনা সংকটের পাশাপাশি পুরনো চামড়ার স্তূপ

চামড়া সংগ্রহে অনিশ্চয়তা

ফারজানা লাবনী   

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চামড়া সংগ্রহে অনিশ্চয়তা

গবাদি পশুর চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল আজহা। অন্যান্য বছর এ সময়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততার কমতি ছিল না। আসন্ন ঈদে পশুর চামড়া সংগ্রহে ট্যানারিগুলো প্রস্তুতি নিতে থাকে। এবারে চিরচেনা সে চিত্র নেই। করোনার আঘাতে বাণিজ্যিক সব ব্যস্ততাই যেন থেমে গেছে।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় গত কয়েক মাসে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির বেশির ভাগ পুরনো অর্ডার বাতিল হয়েছে। নতুন অর্ডার নেই বললেই চলে। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর ট্যানারিগুলোতে এখনো গত বছরে ঈদুল আজহায় সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া পড়ে আছে। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় ট্যানারির মালিকরা অর্থসংকটে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন চামড়া সংগ্রহ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, করোনা ব্যাধি সংক্রমণের আশঙ্কায় এ বছর কোরবানি কম হওয়ারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চামড়া খাতে কাঁচামালের সরবরাহ কম হতে পারে। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, করোনাকালীন নানা প্রতিকূলতা ছাড়াও সাভার শিল্পনগরীতে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যার কারণেও পশুর চামড়া সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে।

তাঁরা বলছেন, প্রাকৃতিক কারণে এ দেশের পশুর চামড়া গুণগতমানে ভালো। বিশ্বব্যাপী এ দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর সবচেয়ে জনসম্পৃক্ত খাত চামড়াশিল্প। আমাদের দেশের চামড়া খাত মূলত রপ্তানিনির্ভর। করোনার কারণে বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় চামড়া খাতে ধস নেমেছে। করোনা সংক্রমণ রোধে দেশে-বিদেশে লকডাউন থাকায় বেশির ভাগ কলকারখানা বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। দোকানপাট সীমিত পরিসরে খোলা রয়েছে। সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে কম বের হওয়ায় বেচাকেনা কম। এতে গত ডিসেম্বর থেকেই চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমেছে। তাই গতবারের কোরবানির ঈদে সংগ্রহ করা পশুর কাঁচা চামড়া এখনো পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা আমাদের চামড়া ব্যবসা শেষ করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কী হাল, তা সবাই দেখতে পাচ্ছে। নতুন অর্ডার নেই। প্রায় প্রতিদিনই পুরনো অর্ডার বাতিল করা হচ্ছে। গতবার ঈদে সংগ্রহ করা পশুর চামড়া এখনো ট্যানারিতে পড়ে আছে। এবারে সংগ্রহ করা চামড়া কোথায় রাখব জানি না। চামড়া শিল্প নগরীর ট্যানারিগুলোতে বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার চামড়া জমে আছে।’

শাহিন আহমেদ বলেন, ‘কোরবানির পশু দুইভাবে জোগাড় হয়। এক, ঘরে পালিত পশু অনেকে কোরবানিতে বিক্রি করে। দুই, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে পশু কিনে কোরবানির জন্য বিক্রি করে। এবারে করোনার কারণে অনেকে পশু কোরবানি নাও দিতে পারে। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে কোরবানিতে পশুর কাঁচা চামড়া সরবরাহ কম হতে পারে।’

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছর সারা দেশে প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর অর্ধেকই জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে দেশে গত বছর কোরবানির ঈদে এক কোটি ১৬ লাখ ‘কোরবানিযোগ্য’ গবাদি পশু ছিল। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ৫৭ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৭১ লাখ ছাগল ও ভেড়া।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চামড়া কেনার জন্য সরকার প্রতিবছর ঋণ দিয়ে থাকে। তা পরিশোধ করলেই পরের বছর আবার পাওয়া যায়। করোনার কারণে চামড়া ব্যবসায় যে ধস নেমেছে তাতে আগের বছরের ঋণ অনেকে শোধ করতে পারেনি। এবারে ঋণ না পেলে এ দেশ থেকে চামড়া ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ১৫৫টি ট্যানারি রয়েছে। অন্যগুলো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এ চামড়া শিল্প নগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ড ভরে গেছে এবং সিইটিপি সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। এতে ট্যানারিতে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। যা প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য সংগ্রহ এবং বিক্রিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। অনেক ট্যানারির মালিক অভিযোগ করেছেন, এখনো সাভার চামড়া শিল্প নগরীর অনেক কাজ বাকি। আর মাত্র এক মাস পরে ঈদুল আজহা। কবে শেষ হবে এসব কাজ?

তবে ঈদুল আজহার আগে সব প্রস্তুতি শেষ হবে—এমন আশ্বাস দিয়ে বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে গত ডিসেম্বর থেকে চীনের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে নিয়মিত হতে পারছেন না। তবে প্রতিকূল এই পরিস্থিতির মধ্যেও কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, কঠিন বর্জ্য ফেলাসহ সব কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারব। এ জন্য আমরা প্রস্তুতি নিতে চেষ্টা করছি। আশা করি সব ঠিকমতো করতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘ঈদের পরের তিন মাস চামড়া প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এ সময় ট্যানারিগুলোতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা হলে সিইটিপির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।’ তিনি জানান, দেশে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ আছে এবং কোরবানির সময় লবণের কোথাও কোনো ঘাটতি হবে না।

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ‘শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আসন্ন ঈদুল আজহায় চামড়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাঁচা চামড়া ও লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে। আশা করি করোনাকালীন ঈদুল আজহায় পশুর চামড়া সংগ্রহে সমস্যা হবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা