kalerkantho

রবিবার । ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৩ ফাল্গুন ১৪২৬। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪১

আইন ভেঙে প্রকল্পের তহবিল সুদে খাটাচ্ছে ইডকল

জিয়াদুল ইসলাম   

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আইন ভেঙে প্রকল্পের তহবিল সুদে খাটাচ্ছে ইডকল

আইন লঙ্ঘন করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শোকজের মুখে পড়েছে সরকারি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে প্রকল্প অর্থায়নের জন্য প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল স্থানীয় তফসিলি ব্যাংকে সুদে (এফডিআর) খাটানোর প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না মর্মে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শোকজ করে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

যোগাযোগ করা হলে ইডকলের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে জবাব দিয়েছি। আশা করছি বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’ আপনারা আইন ভঙ্গ করেছেন—এটা স্বীকার করছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকেই ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শোকজের জবাব দিয়েছে ইডকল। এতে আইন লঙ্ঘনের কথা স্বীকারও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বসতে চায় তারা। সূত্র বলছে, আইন লঙ্ঘন করার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় জরিমানার মুখে পড়তে পারে ইডকল। এ ছাড়া জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হতে পারে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও কেএফডাব্লিউ থেকে প্রকল্প অর্থায়নের জন্য তহবিল পেয়ে থাকে ইডকল। এসব তহবিলের বেশি ভাগের মেয়াদ পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছর। সর্বশেষ হিসাবে দেশের কয়েকটি ব্যাংকে এনএফসিডি (নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট) হিসাবে ১১১ মিলিয়ন ডলার খাটানো আছে। এর মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন ডলারই সরকারি একটি ব্যাংকে রাখা আছে। নিয়মানুযায়ী এই ১১০ বিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট বাস্তবায়নকারী পার্টনার ব্যাংকে চলতি হিসাবে রাখার কথা, যাতে বিভিন্ন শিডিউল অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এখান থেকে কোনো সুদ খাওয়ারও সুযোগ নোই। তবে অব্যবহৃত তহবিল সে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু সেটি না করে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করে সুদ আয় করে আসছিল ইডকল, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক বিনিময় লেনদেন আইনের পরিপন্থী। 

বৈদেশিক লেনদেন অনুমোদিত তফসিলি ব্যাংকগুলো প্রতিদিন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার নেট ওপেন পজিশন প্রতিবেদন আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করে। ওই বিবরণী পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পায়, ১২ মে ২০১৯ থেকে ১৩ মে ২০১৯ সময়ে মাত্র এক কার্যদিবসে একটি সরকারি ব্যাংকের ধারণকৃত এনএফসিডি (সুদবাহী ও মেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব) হিসাবের স্থিতি ১৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ব্যাংকটির কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, সরকারি মালিকানাধীন নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানির (ইডকল) আবেদনে ২০১৯ সালের ১২ মে ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় প্রতিটি সাড়ে ছয় মিলিয়ন ডলারের দুটি এনএফসিডি হিসাব খোলা হয়। একই গ্রাহকের অন্য দুটি এনএফসিডি হিসাবের মেয়াদপূর্তিতে ১০৩ মিলিয়ন ডলার নিট সুদ পরিশোধ করা হয়। এ দুটি লেনদেনের সমন্বিত প্রভাবে ওই দিন এনএফসিডি স্থিতি বেড়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সাল থেকেই ইডকলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ওই ব্যাংক নিয়মিত এ ধরনের এনএফসিডি হিসাব খুলে আসছে। এ বিষয়ে ইডকলের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হলে তারা জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩-এর ১৪(১)(খ) ধারার পরিপালন থেকে অব্যাহতি প্রাপ্তির সূত্রে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সম্পাদন করে আসছে ইডকল। সে অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ইডকলের পরিচালনা পর্ষদের ২২১তম সভায় দাতা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত প্রকল্প অর্থায়নে অব্যবহৃত স্থিতি মেয়াদ বিবেচনায় স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে আমানত হিসেবে খাটানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ইডকলকে বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের প্রাধিকার দেওয়া হলেও ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন আইন ১৯৪৭ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন আইন-২০১৮-এর পরিপালন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। তাই সার্বিক বিবেচনায় ইডকলের সুদবাহী হিসাব খোলা বিদ্যমান আইনের সুস্পস্ট লঙ্ঘন।

বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন ব্যাংকে রাখার আগে ইডকল সুদহার নিয়ে দর-কষাকষি করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিয়মানুযায়ী, প্রকল্প যখন বাস্তবায়ন হবে, তখন ফান্ড তুলে আনার কথা। কিন্তু সেটি না করে আগেভাগেই তহবিল ছাড় করে আনে প্রতিষ্ঠানটি, যাতে তা সুদে খাটাতে পারে। এর মাধ্যমে গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি সুদ বাবদই প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, অনিবাসী বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বৈত নাগরিক সুদবাহী ও মেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব খুলতে পারেন, যা এনএফসিডি নামে অভিহিত হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা