kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪১

পোশাক রপ্তানির নেতিবাচক ধারায় উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



পোশাক রপ্তানির নেতিবাচক ধারায় উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকে কয়েক মাস ধরে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন এ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা মনে করেন, নানা কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। রপ্তানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন রপ্তানিকারকরা। এই নিয়ে আজকের বিশেষ আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক মেহেদী, মাসুদ রুমী, এম সায়েম টিপু ও জিয়াদুল ইসলাম

 

উৎসে কর দ্রুত সমন্বয় করা হোক

ড. রুবানা হক

সভাপতি, বিজিএমইএ

তৈরি পোশাক খাতের উৎসে কর আবারও চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সমন্বয় করার দাবি জানাই। প্রচলিত নিয়ম অনুসারে প্রতিবছর জুলাই থেকে উৎসে কর কার্যকর করা হলেও চলতি অর্থবছর ৩১ অক্টোবর থেকে কার্যকর করতে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর ফলে এই খাতের উদ্যোক্তাদের কঠিন সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তৈরি পোশাকসহ সব খাতের উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে এনবিআর গত অক্টোবর থেকে দশমিক ২৫ শতাংশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই হিসাবে এনবিআর এরই মধ্যে এই খাতের উদ্যোক্তাদের ৮১৫ কোটি টাকা কর্তন করে নিয়েছে। এ টাকা কাটা হয়েছে গত তিন মাস ১০ দিনে। এটা যদি চূড়ান্ত হয় তাহলে এই খাতকে কঠিন সংকটের মুখে পড়তে হবে। আমরা চাই এই সুবিধাটি ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হোক। এই বিষয়ে এরই মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছি। বর্তমান চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।

আমাদের হিসাবে চলতি বছরে এই সময়ে উৎসে কর ৫০০ কোটি টাকার বেশি হবে না। এর মধ্যে ৮১৫ কোটি টাকা কেটে নিয়েছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত কাটা হয়েছে ৩১৫ কোটি টাকা। আমরা এই টাকার সমন্বয় চাই।

দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় অর্জনকারী এই শিল্পটি বর্তমানে দেশ-বিদেশে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই এই খাতকে সহায়তা দেওয়ার অংশ হিসেবে উৎসে কর কমানো হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপনে ভূতাপেক্ষ সময় উল্লেখ করা হয়নি। এর ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বর্তমানে পোশাকশিল্প ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অব্যাহত দরপতন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

 

টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে

সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন

সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ

গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই ছয় মাসের মধ্যে মাঝখানে চার মাস রপ্তানি কমে গেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশের মতো কম। এ সময়ে আমরা যেখানে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করি, সেখানে উল্টো কমে যাওয়াটা আমাদের এ খাতের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো—আমাদের কস্ট অব ফান্ড বেড়ে গেছে। ব্যাংকঋণের সুদের হারও বেশি। ইউটিলিটির প্রাইস দফায় দফায় বাড়ছে। শ্রমিকদের প্রতিবছর ৫ শতাংশ করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরও প্রতি পাঁচ বছর পর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাড়ছে। তাহলে কার পক্ষে সম্ভব এই ব্যবসাটা চালানো? এরই মধ্যে অনেকেই টিকতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকেই টিকে থাকার যুদ্ধ করছেন। এ অবস্থার মধ্যেই সরকার তাদের পক্ষ থেকে সীমিত কিছু সহায়তা দিচ্ছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। আরেকটা বিষয় তুরস্ক, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ভারত এই দেশগুলো ডলারের বিপরীতে তাদের নিজস্ব মুদ্রার অনেকখানি অবমূল্যায়ন করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে করা হয়নি। এখানে ৮৩, ৮৪ ও ৮৫ টাকার মধ্যেই ডলারের দাম আটকে রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এর থেকেও কম দাম পাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিনিয়ত পোশাকের দাম কমানোর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সব মিলে আমরা একটা দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে আছি। তাই এখন দরকার সরকার থেকে সব ধরনের সহায়তা, যাতে এই শিল্পটা তার আগের জায়গায় ফেরত আসতে পারে।

 

ঋণের সুদ কমাতে হবে

মোহাম্মদ হাতেম

জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, বিকেএমইএ

রানা প্লাজা ধসের পর দেশের তৈরি পোশাক শিল্প নানা সংস্কারের পর গত পাঁচ বছরে ঘুরে দাঁড়ালেও এখনো সংকট পিছু ছাড়ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রায় শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে দেশের রপ্তানি আয়। ফলে ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি আয় বাড়লেও অর্থবছরের শুরু থেকেই রপ্তানি আয়ে বেশ ধস নেমেছে। ফলে পোশাক খাতে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় কম হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। তাই এই সংকট উত্তরণ ও বিশ্ববাজারে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে ব্যাংকঋণের সুদের হার নিয়ে নয়ছয় না করে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাই।

শিল্পঋণের সুদের হার বাংলাদেশে এখনো ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলোর কোথাও ৬ শতাংশের বেশি নেই। চীনে ১ থেকে ২ শতাংশ, তুরস্কে ২ শতাংশ, ভারতে ৬ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। অন্যদিকে সরকার গত দেড় বছরের বেশি হলেও সুদের হার ৯ ও ৬ কার্যকর হয়নি। এর ফলে দেশের শিল্প বড় ধরনের বোঝা বহন করছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে।

 

ক্রেতারা পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে

সিদ্দিকুর রহমান

সাবেক সভাপতি, বিজিএমইএ

পোশাক খাতের সমস্যাগুলোর ত্বরিত সমাধানে সরকারের আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। 

এ খাতের উদ্যোক্তা, ক্রেতা, সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগের অভাবে পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না। বিদেশি ক্রেতারা কমপ্লায়েন্সের কথা বলে, শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে বলে। কিন্তু আমরা তা নিশ্চিত করলেও তারা পোশাকের দাম বাড়ায়নি। উল্টো দিনকে দিন কমিয়ে দিচ্ছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কারখানাগুলোর ব্যাপক উন্নতি করেছে, তাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়েছে। কিন্তু আমরা এ জন্য যে নিজেদের স্যাম্পল, নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ দরকার সে বিষয়গুলোতে আমরা খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারিনি। কারণ আমরা তখন কোনোভাবে টিকে থাকার লড়াই করেছি।

এখন বিদেশি ক্রেতারা যে হারে পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে তাতে লাভ তো দূরের কথা, ব্যয়ই উঠে আসছে না। টিকে থাকায়ই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ। ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশে ডলারের অবমূল্যায়ন হয়েছে। যদিও তাদের অবকাঠামো ভালো। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, মিয়ানমারের মতো দেশে যাচ্ছে। নতুন করে আমাদের দেশে তেমন আসছে না।

প্রতিবছর আমাদের ব্যয় বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য ইউটিলিটির খরচ বাড়ছে, শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছি; কিন্তু ডলারের অবমূল্যায়ন হচ্ছে না। প্রতিবছর আমাদের খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ডলারের অবমূল্যায়ন না হয় এবং ক্রেতারা পোশাকের দাম না বাড়ায়, তাহলে আমাদের খরচটা কোন দিক দিয়ে ওঠাব। এ কারণেই আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

 

পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটাতে হবে

ফজলুল হক

সাবেক সভাপতি, বিকেএমইএ

রপ্তানির নেতিবাচক ধারায় আমরা রীতিমতো অস্বস্তির মধ্যে আছি। তবে এই নিয়ে বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এর আগেও দুই দফায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নেতিবাচক ধারার কবলে পড়েছিল। একবার নাইন-ইলেভেনের সময় আরেকবার বিশ্বমন্দার সময়। দুটি সংকটই আমরা কাটিয়ে উঠে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছিলাম। এখন পোশাকের বিশ্ববাজার কিছুটা ধীর গতির মধ্যে আছে। এর প্রভাব আমাদের মধ্যে পড়েছে। আসলে যত উপরেই যাই না কেন, উপরে গেলে সঙ্গে কিছুও চ্যালেঞ্জও বাড়ে। এখন আমাদের জন্য প্রতিযোগিতা একটু কঠিন হয়েছে। এ সময়ে আমাদের যেটুকু প্রস্তুতি থাকার দরকার ছিল, সেটার ঘাটতি আছে। আমরা যথাসময়ে প্রস্তুতি নিতে পারিনি। এ জন্য আমরা ধাক্কা খেয়েছি। এখন কটনের পরিবর্তে নন-কটনের একটি প্রচলন চলছে। এই যে পরিবর্তন সেটাতে খাপ খাওয়াতে পারিনি। আমাদের প্রয়োজনীয় গবেষণাও ছিল না। পরিস্থিতিটা তো এক দিনে তৈরি হয়নি। আমরা খোঁজখবর রাখলে কিছুটা প্রস্তুতি নেওয়া যেত। তা ছাড়া প্রযুক্তির সঙ্গেও তাল মেলানো যায়নি। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। এসব কারণে পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে যাচ্ছে না। আমি মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটাতে হবে। উৎপাদনে দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের খরচ যাতে না বাড়ে সে জন্য সরকারকেও নীতি সহায়তা দিতে হবে। এসব করতে পারলে আমার ধারণা পোশাক খাতে যে নেতিবাচক ধারা চলছে, তা অনেকাংশেই কেটে যাবে।

 

রপ্তানির বাড়াতে টাস্কফোর্স দরকার

সৈয়দ এম তানভীর

পরিচালক, প্যাসিফিক জিনস এবং পরিচালক, চট্টগ্রাম চেম্বার

গেল পাঁচ মাস ধরে পোশাক রপ্তানিতে যে নেতিবাচক ধারা এর জন্য শুধু একটি কারণই নয় বরং অনেক বিষয় এ জন্য দায়ী। বিশেষ করে যারা আমাদের ক্রেতা, সাধারণত ইউরোপের ক্রেতারা জানাচ্ছে তাদের বিক্রি কমে গেছে, তাদের আয় কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, তারা যেখান থেকে পোশাক কিনত, এখন এ রকম অনেক সোর্স তারা পরিবর্তন করেছে। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পণ্য না কিনে ওরা কিনছে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম থেকে। তৃতীয়ত, অনেক দেশ তাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে কারেন্সি ডিভ্যালুয়েট করেছে। এর ফলে তারা ভালো রেট পাচ্ছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। চতুর্থত, আমাদের এখানে বেতন বাড়ানোর ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা খরচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারছে না। কারণ তাদের পণ্যের দাম বাড়েনি। ক্রেতারা বাড়তি দাম দেয়নি। বেশি দাম চাইলেই অন্য দেশ থেকে বা অন্য সোর্স থেকে পোশাক কেনার হুমকি দেয় তারা। ফলে আগের দামে তারা বাধ্য হচ্ছে পণ্য বিক্রি করতে। এতে সংকটে পড়ে লোকসানের কারণে অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে করণীয় হলো, স্বল্প মেয়াদে দ্রুত মুদ্রার বিনিময় হারে একটা সমন্বয় করতে হবে। এটা সবার ক্ষেত্রে নয়। শুধু রপ্তানির একটি অংশ। যাতে করে উদ্যোক্তারা বাড়তি বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পায়। আর সরকারকে আরো কিছু নীতিসহায়তা দিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। যেহেতু কারখানা আমাদের, তাই দায় আমাদেরও আছে। যাতে রপ্তানির ধারা স্বাভাবিক থাকে, এ জন্য পণ্য বৈচিত্র্যকরণে নিজেরা উদ্যোগী হতে হবে। আমি মনে করি বিজিএমইএ ও সরকার মিলে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। এ টাস্কফোর্স সার্বিক খাতের পর্যালোচনা করে একটি করণীয় ঠিক করবে এবং তা বাস্তবায়ন করবে। এ উদ্যোগগুলো নেওয়া হলে হয়তো রপ্তানি বাজারে ইতিবাচক ধারা টেকসই করা যাবে।

 

রপ্তানি প্রবৃদ্ধির স্বার্থে নগদ সহায়তা বাড়াতে হবে

আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ

সাবেক সভাপতি, বিজিএমইএ

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ পুরো রপ্তানি খাত বিশ্ববাজারে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্ববাজারে পোশাক খাতের মন্দা বাজার, প্রতিযোগী দেশগুলো ডলারের বিপরীতে মুদ্রার দরপতন করা এবং দেশের শ্রমিকের মজুরি বাড়ার ফলে দিন দিন পোশাক খাতসহ পুরো রপ্তানি খাতে সংকট বাড়ছে। আর এই সংকট উত্তরণে পোশাক খাতের মেকিং চার্জের (সিএম) ওপর প্রতি ডলারে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা বেশি দেওয়া হোক। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নগদ সহায়তা ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ এবং জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছি। আর এটা করা না গেলে দেশের শিল্প খাত আরো কঠিন সংকটে পড়বে। দেশের শিল্প খাতসহ একই সঙ্গে পুরো অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে।

বিশ্বব্যাপী শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে অনেক দেশ ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার দাম কমিয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান ১০৫ থেকে ১৫৫ রুপি করেছে।

চীন ৬.৬ থেকে ৭.১৫ শতাংশ মুদ্রার দর কমিয়েছে। দেশগুলো শিল্প সক্ষমতা ধরে রাখতে নানা ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। বাংলাদেশকেও বিশ্ববাজারে সক্ষমতা ধরে রাখতে পুরো মুদ্রার দাম কমাতে না পারলেও রপ্তানি খাতে প্রতি ডলারে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা রিটেনশান দেওয়ার দাবি জানাই।

 

অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না

আব্দুল কাদের খান

সভাপতি, বিজিএপিএমইএ

আমাদের যাঁরা বিদেশি কাস্টমার বা বায়ার রয়েছেন, তাঁদের থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এতে যাঁরা সাড়া দিচ্ছেন, তাঁদের ধরতে সবাই অসুস্থ প্রতিযোগিতা করছেন। এতে পোশাকের মূল্য কম পাওয়া যাচ্ছে। যেমন দেশে পাঁচজন উদ্যোক্তার কাছে ১০০ লাখ টন পোশাক আছে। কিন্তু বিদেশ থেকে ৬০ লাখ টনের অর্ডার এলো। এখন ওই পাঁচজনই চাচ্ছেন ওই ক্রেতার কাছে পোশাক বিক্রি করতে। ফলে দাম কমিয়ে দিয়ে নিজেরাই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছেন।

আমাদের দেশে গার্মেন্টের সংখ্যা বা উদ্যোক্তা বাড়েনি। উল্টো অনেকেই এ ব্যবসা থেকে চলে গেছেন। তবে যাঁরা ভালো করছেন, তাঁরা এত ভালো করেছেন যে যাঁর ২০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা ছিল তিনি ৫০ লাখ টনে নিয়ে গেছেন, যাঁর ৫০ লাখ টন ছিল, তিনি ১০০ লাখ টনে উন্নীত করেছেন। অর্থাৎ গার্মেন্টের সংখ্যা না বাড়লেও গার্মেন্টের লাইন কিন্তু বেড়েছে। এ জায়গায় আমার মত হলো, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিধারাটাও আরো স্টাডি করা দরকার ছিল। কারণ বিশ্ববাজারে বিভিন্ন সংকটের কারণে ক্রয়ক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। এতে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। আবার এখন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছেন। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ ডলারের বিপরীতে তাদের স্থানীয় মুদ্রার বেশ অবমূল্যায়ন করেছে। কিন্তু আমরা সেটি করিনি। এটিও আমাদের রপ্তানি কমার আরেকটি কারণ। সব মিলে আমাদের টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

শ্রমিকের দক্ষতা ও পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে

ড. কামরুজ্জামান কায়সার

পরিচালক, মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ

ক্রেতারা পণ্যের ডাইভারসিফিকেশনে চলে গেছে। তারা অন্য দেশ থেকে কম সময়ে কম দামে বৈচিত্র্যময় পোশাক কিনতে পারছে। যেমন মিয়ানমারে আমাদের চেয়ে মজুরি কম, তারা চীন থেকে কম সময়ে কম দামে পোশাকের কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে। ফলে তাদের ওখানে উৎপাদিত পণ্যের খরচ কম। তাই তারা ক্রেতাদের চাহিদামতো কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় মিয়ানমার এগিয়ে থাকছে।

আমাদের এখানে শুধু শ্রম সস্তা। আর সব কিছুই প্রতিকূলে। শুধু একটি মাত্র উপকরণে সুবিধা দিয়ে তো অন্য সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়।

আমাদের পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে এক থেকে দেড় মাস। অথচ মিয়ানমারের লাগে ২১ দিন। এটা একটা বড় বিষয়।

আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর নেই। পণ্য শিপমেন্টের খরচ বেড়ে গেছে। ক্রেতারা দেখবে কোন সোর্স থেকে কম দামে ওরা পণ্য পাবে। তাই তারা মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধেরও নেতিবাচক প্রভাব আছে আমাদের এখানে। এ সুবিধা পাচ্ছে আমাদের প্রতিযোগীরা।

তা ছাড়া আমাদের উৎপাদনশীলতা চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে কম। এটাও একটা কারণ। ক্রেতারা যখন অর্ডার করে তখন এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়।

আমি মনে করি, ‘আমাদের পণ্য বৈচিত্র্যে যেতে হবে। শুধু টি-শার্ট বা লোয়ারঅ্যান্ডের পোশাক বানালে চলবে না। আমরা বেশি শ্রমিক কাজে লাগিয়ে কম দাবি জিনিস বানাচ্ছি। অথচ আমাদের প্রতিযোগীরা কম শ্রমিক দিয়ে আপারঅ্যান্ডের পণ্য বিক্রি করে আমাদের চেয়ে বেশি আয় করছে।

এ জন্য মালিকদের নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে, ব্যাংকঋণের সুদের হার কমাতে হবে, ব্যবসাবান্ধব নীতি-কৌশল প্রয়োগেরও প্রয়োজন আছে। বায়ারদের সর্বস্তরে আস্থা দিতে হবে বিশেষ করে পণ্য বৈচিত্র্য, কম সময়ে ভালো মানের পোশাক বানিয়ে তাদের আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নিলে হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা