kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

আজ ব্যাংকার্স সভা

আবার লাখ কোটি টাকার নিচে নামছে খেলাপি ঋণ

জিয়াদুল ইসলাম   

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আবার লাখ কোটি টাকার নিচে নামছে খেলাপি ঋণ

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা তৎপরতার পর অবশেষে লাগাম পড়ছে খেলাপি ঋণে। ফলে আবার এক লাখ কোটি টাকার নিচে নেমে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলো এই সূচকটির প্রাথমিক হিসাব প্রাক্কলন করে যে তথ্য পাঠিয়েছে, তাতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়াবে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে চূড়ান্ত হিসাবে এই পরিমাণের কিছুটা হেরফের হলেও লাখ কোটি টাকার নিচেই থাকবে। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই প্রান্তিকে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ কমছে।

তবে শতাংশ হিসাবে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের ঘরে থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র। মূলত পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালার আওতায় বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়মিত হওয়ায় এই সূচকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ঋণখেলাপিদের এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এই পর্যবেক্ষণ খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকেরই। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় ওই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে এতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা অংশ নেবেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না।’ কিন্তু জানুয়ারি-মার্চ—এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা বেড়ে প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। পরবর্তী তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল-জুন পর্যন্ত এক হাজার ৫৫২ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পরও সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ২২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের ১১.৯৯ শতাংশ।

তবে আশার কথা, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমেছে। এতে আবার খেলাপি ঋণ এক লাখ কোটি টাকার নিচে নেমে আসছে। তবে খেলাপি ঋণের চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যাবে আগামী মাসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ নীতিমালার আওতায় ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করেছে ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া বছরের শেষ প্রান্তিকে নগদ আদায় কিছুটা বেড়েছে, কিছু ঋণ অবলোপন করে মূল হিসাব থেকে আলাদা করা হয়েছে। এতে শেষ প্রান্তিকে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

জানা যায়, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে ২০১৯ সালের ১৬ মে ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়। এই সার্কুলারের আওতায় যেসব ঋণ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মন্দমানে শ্রেণিকৃত রয়েছে সেই খেলাপিদের অনুকূলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আদায় সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পুনঃ তফসিল এবং ৩৬০ দিন মেয়াদে এককালীন এক্সিট সুবিধা প্রদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। পরে একই বছরের ১৭ নভেম্বর আরেক সার্কুলারে আবেদন করার সময়সীমা আরো ৯০ দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে ঋণখেলাপিরা আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সুবিধা নিতে পারবেন।

আজকের বৈঠকে উপস্থাপিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিশেষ এই সার্কুলারের আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরাই ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মন্দমানে শ্রেণিকৃত ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা প্রদান করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির আবশ্যকতা নেই। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে যে সার্কুলারটি জারি করার পর থেকে এ পর্যন্ত সুবিধা গ্রহণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৭০০ গ্রাহক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেও আবেদন করেছেন। তাঁরা আবেদনপত্রে অভিযোগ করেছেন, ব্যাংকগুলো তাঁদের আবেদন বিবেচনায় নিচ্ছে না। কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা নেওয়ার পরও পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা প্রদান করছে না।

পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, এই সার্কুলারের আওতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৩৬৮টি আবেদন জমে পড়ে। এর মধ্যে ছয় হাজার ৬৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। যার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আবেদন নিষ্পত্তির সংখ্যা চার হাজার ৯২। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ব্যাংকগুলো এই সার্কুলারের আওতায় গ্রাহকদের সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সহযোগিতা বা আশানুরূপ সাড়া প্রদান করছে না। এতে খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে জারি করা সার্কুলারটির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা বাংলাদেশ ব্যাংকের। তাই বৈঠকে ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সুবিধা গ্রহণে আগ্রহী ঋণখেলাপিদের আবেদন গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেবেন গভর্নর ফজলে কবির।

এদিকে আজকের বৈঠকে আরো কিছু এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে সামনের মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেবেন গভর্নর। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনশীল খাত ও ঋণগ্রহীতার অবস্থা সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করার নির্দেশনা আসবে, যাকে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি দ্রুত হ্রাস করা যায়। খেলাপি ঋণের বিদ্যমান কালচার প্রতিরোধকল্পে ব্যাংকগুলো কর্তৃক সময়মতো ঋণ পরিশোধকারীদের পুরস্কৃত করা এবং খেলাপি গ্রাহকদের তিরস্কার করার পরিবেশ সৃষ্টি করার ওপরও গুরুত্বারোপ করবেন গভর্নর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা