kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

পোশাক ও বস্ত্র খাতের ২৫০০ প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি

ব্যাংকের ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় প্রায় অনিশ্চিত

জিয়াদুল ইসলাম   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পোশাক ও বস্ত্র খাতের ২৫০০ প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি

ভালো নেই দেশের রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাত তৈরি পেশাক। নানামুখী সংকটে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় এ খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ছিল। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হার আরো বেড়েছে। বর্তমানে এ খাতেও বিপুল অঙ্কের মন্দ ঋণ রয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রায় আড়াই হাজার খেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে এ পাওনা রয়েছে ব্যাংকগুলোর।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ মানের খেলাপি ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের এই ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি তৈরি করা এক প্রতিবেদন পর্যালোনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক ও বস্ত্র খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের মোট ঋণ স্থিতি ও এর বিপরীতে মন্দমানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ তুলে ধরা হয়েছে।

বিজিএমইএর হিসাবে, গত সাত মাসেই বন্ধ হয়েছে ৫৯টি গার্মেন্ট কারখানা। এতে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২৯ হাজার ৭০০ শ্রমিক। একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতিযোগী দেশের সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ক্রয় আদেশ কমে গেছে। অন্যদিকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ ব্যবসা পরিচালন ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এতে সময়মতো ব্যাংকের ঋণের টাকা টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না অনেক কারখানার মালিক। ফলে বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা। এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়েও। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ।

সংশ্লিস্ট সূত্র বলছে, এ খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে বড় কিছু ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনাও দায়ী। বিশেষ করে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্স, বেনটেক্স, রানকা সোহেল কম্পোজিটসহ নামসর্বস্ব শত শত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে অনেক ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে ঋণ স্থিতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৭১ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের ঋণ স্থিতি ৯৩ হাজার ৪২২ কোটি ও বস্ত্র খাতে ৭৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। একই সময় পর্যন্ত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে মন্দ মানে খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৫ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে তৈরি পোশাকে আট হাজার ২০২ কোটি ও বস্ত্রে ছয় হাজার ৮৯০ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের সবচেয়ে বেশি মন্দ মানের খেলাপি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে, এর পরিমাণ আট হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এক হাজার ২৯৪টি প্রতিষ্ঠানের কাছে এ পাওনা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের। এর মধ্যে তৈরি পোশাকে চার হাজার ১৫৬ কোটি ও বস্ত্রে চার হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের এক হাজার ১৮২টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ রয়েছে পাঁচ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে পোশাকে তিন হাজার ৬৬১ কোটি ও বস্ত্রে এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদেশি ব্যাংকের মন্দ ঋণ রয়েছে ৩২৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের ৮২টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫১৮ কোটি টাকার মন্দ ঋণ রয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর।

এদিকে বিশেষ পুনঃ তফসিল নীতিমালার আওতায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতেও খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ নীরিক্ষা ছাড়াই এ খাতের উদ্যোক্তারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই টানা ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃ তফসিল করতে পারছেন। তবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সুবিধার সদ্ব্যবহার নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্লেষণ

এখন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে

সিদ্দিকুর রহমান

সাবেক সভাপতি, বিজিএমইএ

পাঁচ মাস ধরে এ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অন্য দেশে স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলার যেভাবে শক্তিশালী করে রাখা হয়েছে, আমাদের স্থানীয় মুদ্রার ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। এতে প্রকৃত অর্থে পোশাকের মূল্য কম পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের পণ্য মূলত যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। সেখানেও মন্দা ভাব চলছে। ফলে ক্রয় আদেশ কমেছে। ব্যাংকের টাকা যথাসময়ে ফেরত দিতে পারছে না অনেকেই।

 

বিশ্লেষণ

ঋণের সঙ্গে বেড়েছে খেলাপিও

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

চেয়ারম্যান, এবিবি

ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফলিওর একটা বড় অংশ তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে দেওয়া হয়েছে। এ খাতে ঋণের পরিমাণ যেমন বেশি, খেলাপি হারও তেমন বেশি।

প্রকৃত সমস্যার পাশাপাশি কিছু ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটনাও এর জন্য দায়ী। তবে যে খাতেই হোক, ব্যাংকের কোনো ঋণ মন্দ মানে পরিণত হলে সেটা আদায় হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা