kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

এডিপি বাস্তবায়ন

সরকারি টাকা খরচেই পারদর্শী মন্ত্রণালয়

বিশ্লেষণ

আরিফুর রহমান   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকারি টাকা খরচেই পারদর্শী মন্ত্রণালয়

১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর। এ প্রকল্পে প্রায় পুরো টাকাই ঋণ দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা)।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই প্রকল্পে জাইকার দেওয়া ঋণের মধ্যে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার নির্বাচনসহ নানা জটিলতায় এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। ফলে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণের এক টাকাও খরচ হয়নি।

অথচ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এ বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বরাদ্দ রাখা ৮২৭ কোটি টাকার মধ্যে চলতি অর্থবছরের চার মাসে ৬৬ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারায় ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ২০ হাজার কোটি টাকায়।

সরকারি টাকা খরচ হলেও কেন উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের টাকা খরচ হয়নি জানতে চাইলে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতিকুল হক স্বীকার করেন, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোতে কিছু জটিলতা আছে। জাইকার অর্থায়নে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার নির্বাচনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে। এ জন্য প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। তাই জাইকার টাকাও খরচ হয়নি। যদিও ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন দিয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা খরচ করতে যতটা পারদর্শী, উন্নয়ন সহযোগীদের টাকায় ততটা নয়। উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা খরচে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। এ জন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের টাকা খরচে ততটা আগ্রহ দেখায় না; যতটা আগ্রহ থাকে সরকারি টাকা খরচে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, শুধু বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ই নয়; সরকারের অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতেও একই চিত্র। অর্থবছরের চার মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকারি টাকা খরচ করতে পারলেও অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উন্নয়ন সহযোগীদের এক টাকাও খরচ করতে পারেনি।

উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণবাবদ ৭০ কোটি টাকা রাখা আছে। কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও এই ৭০ কোটি টাকার এক পয়সাও খরচ হয়নি। অথচ সরকারি কোষাগারে বরাদ্দ থাকা ৫৫৫ কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে ৭৫ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় সুরক্ষা সেবা বিভাগে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণবাবদ ৪৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এই বিভাগও এখনো এক টাকাও খরচ করতে পারেনি।

উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা খরচ করতে না পারায় তার প্রভাব গিয়ে পড়েছে পুরো এডিপি বাস্তবায়নের ওপর। আইএমইডি থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা; বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অর্থবছরের চার মাসে এডিপিতে সরকারি কোষাগার থেকে যেখানে খরচ হয়েছে ২২ হাজার ২২২ কোটি টাকা সেখানে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে খরচ হয়েছে মাত্র সাত হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে মাত্র ১০.৬৪ শতাংশ।

আইএমইডির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) পেরিয়ে গেলেও এখনো বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার অত্যন্ত নাজুক। চার মাসে মাত্র এক থেকে পাঁচ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে এমন মন্ত্রণালয়ও আছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ আছে ৫২৪ কোটি টাকা। চার মাসে খরচ হয়েছে মাত্র চার কোটি টাকা। শতাংশের দিক থেকে তা মাত্র ০.৭৪ শতাংশ। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এ বছর এডিপিতে বরাদ্দ আছে তিন হাজার ৮২২ কোটি টাকা। যার মধ্যে চার মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৬৬ কোটি টাকা। আইন ও বিচার বিভাগে বরাদ্দ থাকা ৪৩৫ কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ১.০৯ শতাংশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই বছর বরাদ্দ আছে ১১১ কোটি টাকা। চার মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ৫৪ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে ০.৪৯ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগেরও একই চিত্র।

বৃহৎ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে পাঁচ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২০ শতাংশ। খরচ করার মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে বিদ্যুৎ বিভাগ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা