kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত

জিয়াদুল ইসলাম   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত

স্ট্রেসড অ্যাসেট বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের ভারে ক্রমেই ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকের মূল হিসাবের খেলাপি ঋণ, ঋণ অবলোপন, পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণকে একসঙ্গে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বলা হয়। বর্তমানে দুর্দশাগ্রস্ত অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত বাংলাদেশ ব্যাংকও। তাই এর থেকে উত্তরণে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে পিডাব্লিউসি বাংলাদেশ নামের একটি সংস্থা ‘প্রেজেন্টেশন অন দ্য রিসলিউশন অব স্ট্রেসড অ্যাসেটস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক কি পেপার উপস্থাপন করে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রেজেন্টেশনে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে, সেই ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দেউলিয়া আইন কার্যকর করেছে ভারত। এর মাধ্যমে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে টাকা আদায় করেছে ভারত। প্রয়োজনে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। এ জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করা হয়েছে। ওই সংস্থাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, যে ফর্মুলায় ভারতে খেলাপি ঋণ আদায় করা হয়েছে, সে বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী করা যায় সেটা পরবর্তী সময় ঠিক করা হবে।

সূত্র বলছে, খেলাপি ঋণ কম দেখাতে প্রতিনিয়ত ঋণ অবলোপন এবং পুনঃ তফসিলের পথে হাঁটছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থা ভালো দেখাতে অনেক তথ্যই গোপন করছে। অনেক ঋণ বহু আগেই খেলাপি হওয়ার উপযুক্ত হলেও তা খেলাপি দেখানো হচ্ছে না। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্তদের ঋণখেলাপি হলেও কৌশলে তা গোপন রাখা হচ্ছে। এতে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। তবে আইএমএফের হিসাবে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আবার চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে গত সাড়ে ছয় বছরের এক লাখ ২৮ হাজার ৫০০ কোটি ও ঋণ পুনর্গঠনের ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে দুই লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। যদিও এর মধ্যে কিছু অংশ আদায় হয়েছে।

জানা গেছে, সম্ভাব্য খেলাপি হওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং খেলাপি হওয়ার পর তা নিয়মিত করতে পুন তফসিল করেন ঋণগ্রহীতারা। পুনঃ তফসিল করতে নির্ধারিত হারে নগদ ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ২০১২ সালে ঋণ পুনঃ তফসিলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করা হয়। তবে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনায় শিথিল শর্তে ঋণ পুনঃ তফসিলের ব্যাপক সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর পরই ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃ তফসিলের গতি বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ছয় বছরে (২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত) ব্যাংকিং খাতে এক লাখ ২৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর আগে ২০১৮ সালে ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং ২০১৩ সালে ১৮ হাজার ২০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৫ সালে বিশেষ বিবেচনায় পুনর্গঠন করা হয়েছিল ১১টি শিল্প গ্রুপের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা