kalerkantho

সোনার বাজার অস্থির

সহসাই দাম কমার লক্ষণ নেই
বিক্রিও কমে গেছে

শওকত আলী   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোনার বাজার অস্থির

স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী আমদানির সহজ পথ তৈরি করা হলেও দেশে এখনো আমদানি শুরু হয়নি। এখনো ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে সোনার মূল্যবৃদ্ধি মোটেও থেমে নেই। দুই দিন পর পরই বাড়ছে মূল্যবান এ ধাতুর দাম।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে চলতি মাসেই তিনবার সোনার দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)। প্রতিবারই বিভিন্ন ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এক হাজার ১৬৬ টাকা করে বেড়েছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরি ৫৬ হাজার ৮৬২ টাকা। প্রশ্ন উঠেছে আসলেই কি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা থাকে কি না।

বাজুসের তথ্যানুযায়ী, প্রতি ভরি সোনার মূল্যবৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের দরকে মূল্যায়ন করা হয়। বাজুসের নেতারা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যতটা মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশে ততটা দাম বাড়ানো হচ্ছে না।

লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ (এলএমই), কিটকোডটকম, ট্রেডিং ইকোনমিকসসহ কয়েকটি ওয়েবসাইট ঘেঁটে সোনার দাম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১ জুলাই বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১৪০০ ডলারের নিচে, যা গতকাল মঙ্গলবার ছিল ১৫০৬ ডলার। কিটকো তাদের সংবাদ বিশ্লেষণে বলছে, সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আরো বাড়তে পারে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছে, চীনের সঙ্গে যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে তখন চীন তাদের রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে দিয়ে সোনার রিজার্ভ বাড়ানো শুরু করে। যে কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার সংকট তৈরি হয়েছে এবং দামও বাড়ছে। এ বিষয়টি কিটকোর সংবাদ বিশ্লেষণেও তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ব প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ছেড়ে সোনায় ঝুঁকছেন।

এ বিষয়ে টেডি সিকিউরিটিজের পণ্যবিষয়ক প্রধান বার্ট মেলেক বলেন, উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি আরো পতনের দিকে যাচ্ছে। এর মূল্য দিতে হয় বিনিয়োগকারীদেরই, ফলে তারা আগেভাগেই নিরাপদ জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।

এদিকে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডাব্লিউজিসি) জানায়, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে সোনার চাহিদা বেড়েছে ৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় এবং সোনানির্ভর এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) ব্যাপক বিনিয়োগে মূল্যবান এ ধাতুর চাহিদা বেড়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা ক্রয় করেছে ৩৭৪ টন, যা এক বছর আগের এ সময়ে ছিল ২৩৮ টন।

বাজুসের সাবেক সভাপতি দিলীপ রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বারবার সোনার দাম বাড়ানো নিয়ে আমরাও অস্বস্তিতে পড়েছি। কারণ বিক্রি কমে গেছে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে দাম বাড়ছে তাতে করে শিগগিরই দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।’

তিনি বলেন, সোনার আন্তর্জাতিক বাজারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের বড় প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে সোনার জোগান আসে কয়েকটি মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের ব্যবহার করা পুরনো সোনা বিক্রি করলে তা ব্যবসায়ীরা পায়। ব্যাগেজ রুলের মাধ্যমে বিদেশ থেকে দেশে আসা ব্যক্তিরা সঙ্গে করে সোনা এনে তা বিক্রি করেন। আর সবচেয়ে বড় মাধ্যম চোরাইপথে আসা সোনার চালান। ব্যাগেজ রুলের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ২৩৪ গ্রামের গয়না বা ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনার বার আনতে পারেন, যা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যাগেজ রুলে যে পরিমাণ সোনা বাংলাদেশে আসে তার মাধ্যমে চাহিদার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হয় বলে জানান।

তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিশ্বাস স্বর্ণালয়ের রঞ্জন বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণেই দাম বাড়ছে। এতে করে আমাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসা কমে গেছে।’ এদিকে বাইতুল মোকাররম একটি সোনার দোকানে গয়নার অর্ডার দিতে আসা ক্রেতা নাফিসা বলেন, ‘আমার ছোট বোনের বিয়ের গহনার অর্ডার দিয়ে গেলাম। যে দাম, তাতে করে বিয়েটা না থাকলে এখন কোনোভাবেই গহনা বানাতাম না।’

এদিকে চোরাইপথে সোনা আসা রোধ করতে ‘স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতিমালায় আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আগ্রহীরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন শুরু করেছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। গত ১৯ মার্চ থেকে আবেদনপত্র বিতরণ শুরু হলেও তা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পৌঁছেনি বলে জানা গেছে। এ সময়ে একটি মাত্র আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এলেও তাতে প্রয়োজনীয় কাজগপত্রের ঘাটতি থাকায় তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে থাকা সোনার মজুদের ওপর কর প্রদান করে। প্রতি ভরি অবৈধ সোনা এক হাজার টাকা কর দিয়ে বৈধ করে নেয়।

মন্তব্য