kalerkantho

খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশে নামাতে হবে এ বছরই

বড় খেলাপি তদারকিতে বিশেষ মনিটরিং সেল
প্রতিটি ব্যাংককে দিতে হবে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা

জিয়াদুল ইসলাম   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশে নামাতে হবে এ বছরই

যেসব ব্যাংকের মোট ঋণ স্থিতির ৫ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে, তাদের এ বছরের মধ্যেই তা ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এ ছাড়া ১০০ কোটি টাকা বা এর বেশি অঙ্কের ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তদারকিতে সব ব্যাংকে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না বলে ঘোষণা দেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ঋণখেলাপিদের নানামুখী ছাড়ের পথও তৈরি করেন। প্রথমে ঋণ শ্রেণীকরণ ও অবলোপন নীতিমালায় ছাড় দেওয়া হয়। এরপর খেলাপিদের গণসুবিধা দিতে বিশেষ পুনঃ তফসিল নীতিমালা জারি করা হয়। যদিও ওই নীতিমালার ওপর হাইকোর্ট প্রথম দফায় এক মাস এবং দ্বিতীয় দফায় আরো দুই মাসের স্থিতিবস্থা দেন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আবেদনে আপিল বিভাগ ওই নীতিমালা দুই মাসের জন্য স্থগিত করেন। সে অনুযায়ী পুনঃ তফসিল নীতিমালা দুই মাসের জন্য কার্যকর হয়েছে। এত সব ঘটনার মধ্যেই গত জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। মার্চ শেষে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি সব খাতের ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে; যা নিয়ে বিব্রত সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে চাপে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। তাই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ ও তা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে গত মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের জন্য আলাদা দুটি কমিটি গঠন করা হয়। সম্প্রতি বেসরকারি ব্যাংকের জন্য গঠিত কমিটির এক সভায় খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংকগুলো থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা নিয়ে সবাই চিন্তিত। তবে রাতারাতি এটা কমানো সম্ভব নয়। তাই ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য প্রত্যেকটি ব্যাংক থেকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সবারই দায়িত্ব খেলাপি ঋণ ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রাখা। তবে মুশকিল হচ্ছে আমরা চাইলেই সব কিছু পারি না।’ এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে খেলাপি ঋণ। তবে এটা কারো ইচ্ছায় হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মপরিকল্পনা চাইলে অবশ্যই দেব। এ ধরনের পদক্ষেপ সবার জন্যই ভালো হবে। কারণ এর ফলে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চাপে থাকবে।

সূত্র বলছে, গত ১০ বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে বেশ কয়েকটি বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক এবং অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট লেদার অন্যতম। আলোচিত এসব কেলেঙ্কারিতে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিশেষভাবে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের আধিক্য বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের বেশি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি ১২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার উচ্চমাত্রায় রয়েছে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৫ থেকে ৯৭ শতাংশের মধ্যে। ব্যাংকিং খাতের প্রায় বড় সব অনিয়মও হয়েছে এসব ব্যাংকে। এর বাইরে বেসরকারি খাতের আরো ১১টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ৭ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ আছে এমন ব্যাংক আছে আরো ১৬টি।

সূত্র আরো জানায়, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কৌশল হিসেবে বড় ঋণখেলাপিদের বিশেষ তদারকিতে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য প্রত্যেক ব্যাংকে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। এই সেল ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের খেলাপি গ্রাহকদের বর্তমান অবস্থা যাচাইসহ ঋণ আদায় জোরদার করবে। শুধু তাই নয়, ঋণ আদায়ে নিয়মিত তদারকির অগ্রগতি প্রতিবেদন তাঁদের ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উপস্থাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেও পাঠাতে হবে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রায় ১২টি ব্যাংকের ক্রেডিট বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকও হয়েছে। ওই বৈঠকে ব্যাংকগুলোও বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের সেল গঠনের পরামর্শ দিয়ে আগামী সপ্তাহের মধ্যে একটি সার্কুলার জারি করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে শীর্ষ ৩০০ খেলাপির তালিকা দেন অর্থমন্ত্রী।

মন্তব্য