kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

খরার দাপটে মরেছে দেদার

চিংড়ির দরপতনে দিশাহারা চাষি

খুলনা জেলায় ২৫ হাজারেরও বেশি বাগদা চিংড়ির খামার
এবং ৫০ হাজারেরও বেশি গলদা চিংড়ির খামার রয়েছে

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিংড়ির দরপতনে দিশাহারা চাষি

টানা গরমে খামারে চিংড়ি মরছে আবার বাজারে দামও আশানুরূপ নয় তাই উভয় সংকটে পড়েছে চাষিরা। তারা বলছে, দিন দিন উৎপাদন খরচ বাড়ছে অথচ আনুপাতিক হারে বিক্রয়মূল্য না পাওয়ায় লোকসানে পড়তে হচ্ছে উৎপাদনকারীদের। আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির দাম ও চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে দাম কমছে। তার ওপর এ বছর ছিল অতি খরাজনিত কারণে চিংড়িতে মড়ক। ফলে চাষিরা এবার উৎপাদন খরচই তুলতে পারবে না।

এখন খামার থেকে বাগদা চিংড়ি ওঠানোর সময়। কিন্তু কয়েক দিন আগের অতি গরমে খামারে চিংড়ি মরেছে। অন্যদিকে গলদার খামারেরও চিংড়ি মরেছে। পোনা দেওয়ার সময়ে বাজারে এর দাম বেড়ে গেছে। উৎপাদন উপকরণগুলোর দাম বেশি অথচ উৎপাদিত পণ্যের দাম কম হওয়ায় চাষিদের মধ্যে চিংড়ি চাষে অনীহাও দেখা দিচ্ছে।

মত্স্য অফিস সূত্র জানায়, চিংড়ি প্রায় শতভাগ (বাগদা ও গলদা) রপ্তানি পণ্য হওয়ায় বিদেশি বাজারের দামের সঙ্গে এই পণ্যটির দাম ওঠানামা করে। আবার স্থানীয় রপ্তানিকারকরাও জোটবদ্ধভাবে অনেক সময় দাম কমিয়ে রাখে। অবশ্য বেশির ভাগ রপ্তানিকারক সরাসরি উৎপাদনকারীর কাছ থেকে চিংড়ি কেনে না। তারা এজেন্টের মাধ্যমে চিংড়ি কেনে। এজেন্টরা দাম কমার অজুহাত তুলে উৎপাদনকারীদের ঠকিয়ে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এবারে খরাজনিত ভাইরাসে চিংড়িতে মড়ক দেখা দেওয়ায় অনেক চাষি বাজারে চিংড়ি তুলতেই পারেনি।

একাধিক উৎপাদনকারী জানান, জমির ভাড়ার টাকা (হারি), চিংড়ির খাবার, পোনা সংগ্রহে ব্যয়, পাহারাদারের বেতনসহ প্রভৃতি খাতে খরচ দিনকে দিন বাড়ছে। এতে প্রতি কেজি চিংড়ি উৎপাদনের খরচই পড়ছে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা; বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। অন্যদিকে বাগদায় খাবারের খরচ একটু কম হলেও এবারে খরার দাপটে দেদার চিংড়ি মরেছে।

খুলনা জেলায় ২৫ হাজারেরও বেশি বাগদা চিংড়ির খামার এবং ৫০ হাজারেরও বেশি গলদা চিংড়ির খামার রয়েছে। ভাইরাস ও নানা রোগের প্রকোপ মোকাবেলা করে উৎপাদনকারীরা যখন চিংড়ি বাজারজাতকরণ শুরু করে তখনই বাজারে আশানুরূপ দাম মেলে না। গত বছর এ সময়ে যে চিংড়ি কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে; বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। অনেক সময় উৎপাদনকারী ক্রেতাদের কাছে বাকিতে বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছে। তবে একাধিক জন বলেন, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে চিংড়ির দাম বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই সময়ে যে পরিমাণ চিংড়ি বাজারে আসার কথা, তা না আসায় দাম সামান্য বেড়েছে বলে বলা হচ্ছে।

খুলনা বিভাগের মধ্যে গলদা চিংড়ি চাষে ডুমুরিয়া উপজেলা শীর্ষ স্থানে। আমিরুল নামের এক গলদা চাষি জানান, বেশি দাম পাওয়ার আশায় তিনি খামারে গলদা রেখে দিয়েছিলেন, কিন্তু গরমে খামারে অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয়। একদিন সকালে তিনি সব চিংড়ি মরে ভাসতে দেখেন। সেসব চিংড়ির গায়ের রং লালচে বর্ণ ধারণ করেছিল, যা তিনি বাজারে বিক্রি করতেও পারেননি।

খুলনা জেলা মত্স্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনাসহ উপকূলীয় জেলার প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমিতে প্রতিবছর বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ হয়। এর মধ্যে শুধু খুলনায় চিংড়ি চাষে যুক্ত রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এখানে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়। এর পরই চিংড়ির উৎপাদন কমছে। এ বছর ৬০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদিত হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৪ হাজার চিংড়ি ঘের রয়েছে। যার প্রায় অর্ধেকটাই গলদা চিংড়ির ঘের। চিংড়ি উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা বাগেরহাট।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক এস হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে বিদেশি বাজারে চিংড়ির দাম কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ার যে ধকল তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। পাউন্ডের দরপতন এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক টানাপড়েনের প্রতিক্রিয়ায় আমরা বিপদে পড়েছি। এবারে খুলনা অঞ্চলে অতি খরা, প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি না হওয়ায় খামারে চিংড়ি ব্যাপকভাবে মারা পড়েছে। এতে উৎপাদনকারীরা নতুন বিপদের মুখে পড়েছে।

 

মন্তব্য