kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

এবিবির সংবাদ সম্মেলন

খেলাপি ঋণের কারণ ব্যাংকার নয়, গ্রহীতা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খেলাপি ঋণের কারণ ব্যাংকার নয়, গ্রহীতা

এবিবি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

খেলাপি ঋণের জন্য বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকারদের দায়ী করা হলেও মূল সমস্যাটা ঋণগ্রহীতা থেকেই হয়। তবে নানামুখী মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকার পরও ব্যাংকাররাও কিছু ভুলত্রুটি করেন বলে জানিয়েছে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে এসব কথা জানান বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা। এ সময় তাঁরা বিগত ৫-১০ বছর সময়ে দেশে ব্যাংক খাতের অবদান নিয়ে কথা বলেন। পাশাপাশি ব্যাংক খাত থেকে গত ১০ বছরে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা লুট হয়েছে বলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত তথ্যের সমালোচনা করা হয়। যদিও এবিবির সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সিপিডি প্রকাশ করা তথ্য নিয়ে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে না। তবে গবেষক ও বিশ্লেষকদের নেতিবাচক বিশ্লেষণ আমাদের পীড়া দেয়। তাদের উচিত আমাদের অর্জন নিয়েও কথা বলা।

এ সময় এবিবির সাধারণ সম্পাদক ও ব্যাংক এশিয়ার এমডি মোহাম্মদ আরফান আলী, সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস উল ইসলাম, সিটি ব্যাংকের এমডি সোহেল আর কে হোসাইন, এবিবির সাবেক সভাপতি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ খান, ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী আলী রেজা ইফতেখারসহ বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় প্রধান নির্বাহীরা জানান, ব্যাংকের ঋণখেলাপি হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সেগুলো ঠিকঠাকভাবে বলা হয় না বা উঠে আসে না। তবে ঋণগ্রহীতাই এর জন্য দায়ী। কারণ ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার একটি সংস্কৃতি এ দেশে রয়েছে। তবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাজের মধ্যে যে একেবারেই ভুলত্রুটি নেই তা বলা যাবে না। কাজ করতে গেলে ভুলত্রুটি হবেই।

তাঁরা জানান, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ না পেয়ে দিনের পর দিন ভুগতে থাকেন। তাঁরা টাকা দিতে পারেন না। এ সমস্যাগুলো কখনো মিডিয়ায় তুলে ধরা হয় না বলেও দাবি করেন নেতারা।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, “ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সে চেষ্টা ব্যাংকাররা করে যাচ্ছেন। তবে আমাদের দেশে ‘নন পেয়িং কালচার’ রয়েছে। যাতে করে নিজের আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ঋণ দিলেও সেটা ফেরত পেতে সমস্যা হয়। যার প্রভাব ব্যাংক খাতেও রয়েছে। তবে ব্যাংকারদের হাত ধরেই এ দেশে শিল্পায়ন হয়েছে এটাও স্বীকার করতে হবে।”

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে আনিস এ খান বলেন, বিভিন্ন কারণে ঋণখেলাপি হয়। একসময় ছিল কারখানার জন্য ব্যাংকঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি বসিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে তা চালু করতে পারেননি উদ্যোক্তারা। নিত্যপণ্য আমদানি করে তার দাম পড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়তে হয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতারা খেলাপি হয়ে গেছেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, অর্থনীতির আকার বহুগুণ বেড়েছে। ব্যাংক খাতসহ সবাই মিলে এ উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সব সময় নেগেটিভ দিক নিয়ে আলোচনা হয়। কাজ করতে গেলে ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। যেসব নিউজ সংবাদমাধ্যমে আসে সেগুলো একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে। ব্যাংক খাতে অনেক সাফল্য আছে সেগুলো নিয়েও কথা বলা উচিত।

মো. আরফান আলী বলেন, ব্যাংকের আকার অনেক বড় হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং চালু করার ফলে অনেক মানুষ সেবা পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর ১০ হাজার শাখা, ৭৫৮টি ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান, ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ১৭টি বীমা ও ৮২ হাজার ৩৪৬টি সমবায় সমিতি গড়ে উঠেছে। এর ফলে ব্যাংকিংয়ে সবাই আসছে। ২০১৩ সালে এক লাখ মানুষের জন্য শাখা ছিল আটটি এখন বেড়ে হয়েছে ৯টি, এটিএম ছিল পাঁচটি থেকে বেড়ে হয়েছে আটটি, মোবাইল আউট ছিল ১৮৬টি এখন বেড়ে হয়েছে ৬৬৭টি। বর্তমানে ৫০ শতাংশ মানুষের অ্যাকাউন্ট আছে, যেখানে ২০১৪ সালে ছিল ৩১ শতাংশ। মোট অ্যাকাউন্টের ৩৫ শতাংশ নারীদের। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে।

আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘ব্যাংকগুলো অনেক ভালো করছে। ছোট আকারের যেকোনো ঝুঁকি মোকাবেলা করতে পারে দেশের ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া মাঝারি ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলা করার ক্ষমতা রয়েছে ৭৫ শতাংশ ব্যাংকের। এই ক্ষমতা আমরা ধীরে ধীরেই অর্জন করেছি।’

আনিস এ খান বলেন, ‘বিভিন্ন দিক থেকে কমপ্লায়েন্স খাত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরা জবাবদিহি করছি। আমাদের ব্যাংকগুলো ভালো করছে বলে বিদেশিরা আসছেন এখানে ব্যবসা করতে।’

আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি শাহ এ সারওয়ার বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ঐতিহ্যগত বিনা পুঁজি থেকে আমরা পরিশ্রম করে অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করেছি। এর পেছনে ব্যাংকগুলো অর্থায়ন করে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। কিছু ভুলের কারণে শুধু নেতিবাচক আলোচনা করা উচিত নয়।’

শামস উল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংক খাত শক্তিশালী বলেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হচ্ছে। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করা সম্ভব হচ্ছে। এসব উন্নয়নের চিত্র নিয়ে আমরা বাহাস করতে চাই। যে কেউ আমাদের সঙ্গে বাহাস করতে আসতে পারেন।’

ইসলামী ব্যাংকের এমডি মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের চেষ্টার ফলে উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ২২ পরিবারের হাতে ছিল। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর পোশাক খাতসহ বড় বড় শিল্প ব্যাংকের হাত ধরে বড় হয়েছে।

সব শেষে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু সব সময় সমস্যা বললে কাজ করা যাবে না। পজিটিভ চিন্তা করে কাজ করতে হবে। প্রতি বছরই চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। তবে ব্যাংক খাতের জন্য সরকার নানাভাবে সহযোগিতা করছে।

মন্তব্য