kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

কোনো কাজেই যুক্ত নয় ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণী

আরিফুর রহমান   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোনো কাজেই যুক্ত নয় ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণী

পড়াশোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নেই, প্রশিক্ষণেও নাম নেই, অর্থাৎ কোনো কিছুর সঙ্গেই যুক্ত নেই দেশে এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা এখন ৭৪ লাখ। যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। দেশের অর্থনীতিতে তারা কোনো অবদান রাখতে পারছে না। অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কর্মক্ষম এসব তরুণ-তরুণী ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে তারা এখন বলতে গেলে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী এই ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণীকে বেকার বলা যাবে না। কারণ আইএলওর সংজ্ঞা বলছে, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি যদি সপ্তাহে এক ঘণ্টার জন্য কাজ না করে থাকে এবং এক মাসে কাজ খুঁজেও না পেয়ে থাকে তাকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৫ বছরের বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তি সপ্তাহে যদি এক ঘণ্টার জন্য হলেও মজুরির বিনিময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, তাকে বেকার বলা যাবে না। ওই ব্যক্তিকে কর্মক্ষম হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে ৭৪ লাখ কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীকে বেকার বলা যাবে না। কারণ তারা কাজের জন্য চেষ্টা করেনি। ফলে কাজ পায়নি।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণীর মধ্যে অবশ্য তরুণীর আধিক্য বেশি। এর মধ্যে ৬১ লাখ হলো তরুণী বাকি ১৩ লাখ তরুণ। বলা যাবে না, তারা অশিক্ষিত। তাদের দিয়ে কিছু সম্ভব নয়। বিবিএসের তথ্য বলছে, এই ৭৪ লাখের মধ্যে ৬৫ লাখই শিক্ষিত। বাকি আট লাখ অবশ্য অশিক্ষিত। বয়সের আরো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীর সংখ্যা বেশি ৪৬ লাখ। বাকি ২৮ লাখের বয়স ১৫ থেকে ১৯-এর মধ্যে। শ্রমশক্তি জরিপ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিবিএস।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ‘দেশে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার খুবই কম। পরিবার আর সংসার সামলানোকে তারা কাজ বলে মনে করে। এই যুক্তি নারীদের বেলায় খাটলেও তরুণদের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়; ১৩ লাখ। এই সংখ্যা কোনো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার সমান। তারা তো আর সংসার সামলাচ্ছে না। তারা কী করে আমরা তা জানি না। বিশাল এই তরুণ জনগোষ্ঠী আইফোন ব্যবহার করছে; না কি রাজনীতি করছে, না কি কোনো খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে এ বিষয়ে বিস্তারিত আমরা জানি না। এটা সত্যি ভাববার বিষয়।’

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে কোনো কাজ না করার সংখ্যা বেশি। ঢাকা বিভাগে বসবাসরত ২৫ লাখ তরুণ-তরুণী এই মুহূর্তে কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। চট্টগ্রাম বিভাগে এই সংখ্যা ১৫ লাখ। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে চার লাখ, খুলনা বিভাগে সাত লাখ, রাজশাহী বিভাগে আট লাখ, রংপুর বিভাগে আট লাখ এবং সিলেট বিভাগে ছয় লাখ তরুণ-তরুণী এখন কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে কেন এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো কাজে আসছে না এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণী বাংলাদেশের সম্পদ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া এই সমস্যা সমাধান হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসার মতো এখনো ওই পরিবেশ তৈরি হয়নি। তা ছাড়া নারীরা এখনো পরিবার সামলানোকেই প্রধান কাজ হিসেবে মনে করে। শিক্ষাব্যবস্থাতে বড় ধরনের গলদ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না বলেও অভিযোগ বিশ্লেষকদের।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সারা দেশে এখন মোট তরুণ-তরুণীর সংখ্যা দুই কোটি ৭৬ লাখ। যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ৭৪ লাখ তরুণ-তরুণী কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়। দুই কোটি দুই লাখ তরুণ-তরুণীর মধ্যে কেউ পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত, কেউ বা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত আবার কেউ প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুই কোটি ৭৬ লাখ তরুণ-তরুণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করছে ঢাকা বিভাগে; ৯৪ লাখ। চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৪ লাখ, রাজশাহী বিভাগে ৩৫ লাখ, খুলনা বিভাগে ২৮ লাখ, রংপুর বিভাগে ৩১ লাখ এবং সিলেট বিভাগে ১৮ লাখ তরুণ-তরুণীর বসবাস।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম মনে করেন, তরুণ-তরুণীদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করে দিতে আমাদের কারিগরি শিক্ষার দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের ব্যাংকঋণ দিয়ে হলেও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারা আমাদের জন্য সম্পদ। কিন্তু বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাদের পড়াশোনার কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় কিছু করতে পারছে না। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে বাজারে তাদের কোনো চাহিদা নেই। কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলেও মত দেন তিনি।

বিশাল এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে কী করণীয় তা জানতে চাইলে বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রথমত, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণ নিয়ে হলেও উদ্যোক্তা তৈরি করা, তৃতীয়ত, বেশি করে শিক্ষা কর্মসূচি হাতে নেওয়া, চতুর্থত, উন্নত বিশ্বের মতো বেকার ভাতা চালু করা এবং পঞ্চমত, প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে তাদের সেখানে সম্পৃক্ত করা। আর এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাড়তি বিনিয়োগের তাগিদ দেন তাঁরা। ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সরকারকে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার কারিকুলাম পরিবর্তন করে কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো কাজই যে ছোট নয়, এ বিষয়ে দেশের মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন আনা জরুরি।

আইএলওর সংজ্ঞা ব্যবহার করে বিবিএস বলছে, বাংলাদেশে এখন মাত্র ২৬ লাখ বেকার। যদিও এই সংখ্যা নিয়ে আপত্তি আছে দেশের অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, দেশে বেকারের সংখ্যা বেশি। এ জন্য বিদ্যমান সংজ্ঞা বদলের দাবিও জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা