kalerkantho

জটিল হচ্ছে ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি

বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকিতে বিশ্ব

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকিতে বিশ্ব

বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা’ বানানোর জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণাতেই তিনি চীনসহ বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুড়ে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি স্পষ্ট করেন। সেই অবস্থান ক্রমান্বয়ে আরো জটিল হচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি তা প্রমাণও করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পেইচিংয়ের বিরুদ্ধে তাঁর এই অবস্থান শুধু একটি বাণিজ্য যুদ্ধ নয়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি করছে। যা জড়িয়ে আছে উত্তর কোরিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সমুদ্র পর্যন্ত।

গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি স্টিল আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার চিন্তা করছেন বলে জানান। তাঁর এমন ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছ থেকে। এর জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বলেছে, ট্রাম্প এমনটি করলে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপ করবে। কানাডা ও ফ্রান্স বলেছে, এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। তবে কিছুটা পরিমিত জবাব দিয়েছে চীন। গতকাল রবিবার চীনের সহপররাষ্ট্রমন্ত্রী জংগ ইসুই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ চায় না চীন। তবে আমাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে সে ক্ষেত্রে আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব না।’

এসব কথার জবাবে ট্রাম্প টুইট করে জানান, অন্যদের সুবিধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য যুদ্ধ অনেক ভালো এবং জেতাও সহজ। এর পাশাপাশি ইইউ থেকে গাড়ি আমদানিতেও শুল্ক আরোপের হুমকি দেন তিনি। ইইউর গাড়ি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র।

আরেকটি টুইটে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের ‘বোকা’ বাণিজ্যনীতির কারণে বছরে ৮০০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পড়ছি আমরা।”

প্রসঙ্গত, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি স্টিল আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ সালে দেশটি ৩৫.৬ মিলিয়ন টন স্টিল আমদানি করেছে, যার বেশির ভাগই এসেছে ইইউ, চীন, কানাডাসহ বেশ কিছু দেশ থেকে।

ইতিপূর্বে সৌর প্যানেল থেকে শুরু করে ওয়াশিং মেশিনসহ বেশ কিছু আমদানি পণ্যে বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে মেধাস্বত্ব অনুশীলন নিয়েও চীনের বিরুদ্ধে একটা তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কথার চালাচালি ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, এতে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওক্সফোর্ড ইকোনমিকস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ট্রাম্পের ঘোষণায় অন্য দেশগুলোও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে, যা একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করবে এবং বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত করবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে নিম্নমুখিতার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) জানিয়েছে, এতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এশিয়া সোসাইটি পলিসির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার বলেন, ‘আমরা যদি বাণিজ্যে ও বিনিয়োগে চীনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিই, তবে তারাও অন্য ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেবে। যেমন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় চীন সহযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে।’

এ নিয়ে সিএনএন মানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি ওয়াশিংটন-পেইচিং বাণিজ্য যুদ্ধ হয় তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় কম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাপল, বোয়িং, ইন্টেলসহ আরো কিছু কম্পানি। যারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে পড়ে যাবে। তবে এ প্রসঙ্গে র‌্যাবোব্যাংক গ্রুপের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থবাজার গবেষণা প্রধান মিখায়েল এভ্রি মনে করেন, তাতে চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, যদি তারা বোয়িং বয়কট করে তবে এয়ারবাস একচেটিয়া ব্যবসা করবে, এতে পণ্যের দাম বাড়বে। যদি তারা অ্যাপল বয়কট করে তবে চীনে অ্যাপলের কারখানায় কর্মরত চীনারা চাকরি হারাবে। এএফপি, রয়টার্স, সিএনএন মানি।

মন্তব্য