kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ বাড়ছে

শেখ শাফায়াত হোসেন, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ বাড়ছে

ভবানীপুরে ব্যাংক এশিয়ার প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে সেবা নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা রেনু বেগম। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাজারের এক পাশে ইটের তৈরি ছোট্ট একটি ঘর। ঘরের ভেতর এক পাশে কাচ ঘেরা একটি ক্যাশ কাউন্টার। অন্য পাশে একটি টেবিলে কম্পিউটার, প্রিন্টার ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার যন্ত্র নিয়ে বসে আছেন একজন কর্মী। এই ঘর থেকেই ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমানো ও তোলা, ঋণ বিতরণ, রেমিট্যান্সের টাকা গ্রহণ ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধসহ বেশ কয়েক ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছে ভবানীপুর গ্রামসহ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বাসিন্দারা। আশপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ব্যাংকের শাখা না থাকায় গ্রামবাসীর কাছে এই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটই এখন ছোট্ট একটি ব্যাংক শাখায় পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশে প্রথমবারের মতো এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে ব্যাংক এশিয়া। ভবানীপুর গ্রামের মুহম্মদ ইসলাম শেখ ব্যাংক এশিয়ার প্রথম এজেন্ট। বেশ গুছিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছেন তিনি। আউটলেটের বাইরে সাঁটানো সাইনবোর্ডে ব্যাংক এশিয়ার মনোগ্রাম ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লোগো দেখে চেনা যায় এটি একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট।

আশপাশে ব্যাংকের শাখা নেই এমন এলাকার ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিতদের স্বল্প পরিসরে ব্যাংকিং সেবা দিতে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়া প্রথম এই সেবা চালু করে। সমঝোতা স্মারকে চুক্তির বিপরীতে এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হয় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদন নিয়েছে ১২টি ব্যাংক। এর মধ্যে কার্যক্রমে এসেছে ১১টি ব্যাংক। এজেন্টের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে।

ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট মুহাম্মদ ইসলাম শেখ বলেন, ‘তিন বছরে তাঁর এক হাজার ৭০০-এর মতো গ্রাহক হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি লেনদেন হচ্ছে। আমানত সংগ্রহ করছেন তিন কোটি টাকার বেশি। তবে প্রথমে এজেন্ট ব্যাংকিং করা এতটা সহজ ছিল না। অনেক গ্রাহকই আস্থা পেত না। অনেকে ভয় পেত টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় নাকি। কিন্তু এখন আর সেই ভয় নেই তাদের। আস্থা তৈরি হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে।’

ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে কোনো ব্যাংকেরই শাখা নেই। তবে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ইছাপুরা ইউনিয়নে ব্যাংকের শাখা আছে। বাড়তি পয়সা খরচ করে অটোরিকশা ভাড়া করে অথবা হেঁটে জাপানপ্রবাসী ছেলের পাঠানো রেমিট্যান্স তুলতে ইছাপুরার ওই ব্যাংক শাখায় যেতে হতো ভবানীপুরের বাসিন্দা রেনু বেগমকে। বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর পর তাঁর সেই কষ্ট লাঘব হয়েছে। এখন বাড়ির পাশেই ভবানীপুর বাজারে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট।

গতকাল ছেলের পাঠানো রেমিট্যান্স তুলতে এসে রেনু বেগম এ প্রতিবেদককে জানান, বর্তমানে তাঁর তিন ছেলে ও জামাতা বিদেশে রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্স তুলছেন ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে। আগে কেবল টাকা তুলে আনতেন, এখন ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খুলে সেই হিসাবে টাকাও জমা রাখছেন। সেখানে কোনো বাড়তি খরচ নেই, কেবল নির্ধারিত সেবা মাসুল দিয়েই ব্যাংকের অনেক ধরনের সেবা পাচ্ছেন।

তিন বছর আগে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর ওই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর ১৭ জানুয়ারি এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস হিসেবে পালন করে ব্যাংক এশিয়া। গতকাল মঙ্গলবার এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস পালন উপলক্ষে সিরাজদিখানের জৈনসার ইউনিয়নের ভবানীপুর বাজারে এক গ্রাহক সম্মেলনের আয়োজন করে ব্যাংক এশিয়া। এ উপলক্ষে ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটা সময় আসবে যখন দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি করে ব্যাংক হিসাব থাকবে। সেই হিসাবটি সেই নাগরিকের ভাগ্যোন্নয়ন ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে।’

প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৯টি জেলার ২২২টি উপজেলায় এক হাজার ২০০-এর ওপরে এজেন্ট আউটলেট রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার। এ ছাড়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমেও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা এক লাখ ৪০ হাজার।

সম্মেলনে ব্যাংক এশিয়ার চ্যানেল ব্যাংকিংয়ের প্রধান ও এসইভিপি আদিল রায়হান বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা দেওয়াসহ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা বিতরণসহ অনেক ধরনের আর্থিকসেবা দিচ্ছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা