kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে বিপাকে বাংলাদেশ

মোশতাক আহমদ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে বিপাকে বাংলাদেশ

ভারতের বাজারে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানি। ১৯৮৭ সালের এক আইনের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাট নেওয়ার পথ বন্ধ করেছে এক আদেশ জারি করে। ১০ সেপ্টেম্বর আদেশ জারির আগ পর্যন্ত যেসব পাটবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে পৌঁছেছে, বাংলাদেশের অনুরোধে শুধু সেগুলো গ্রহণ করতে রাজি হয়েছে ভারত। তবে ভারতীয় আমদানিকারকরা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বলেছেন, খুব শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট না নিলে ভারতের চলবে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তোফায়েল আহমেদ ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সোমবার বৈঠক করে ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন কি না এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা দ্রুত যাচাই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ও ডাব্লিউটিও সেলকে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বাংলাদেশ এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. শওকত আলী ওয়ারেছী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারত ১০ সেপ্টেম্বর আদেশ জারি করে তাদের দেশের পাট আমদানিকারকদের লাইসেন্স স্থগিত করে নতুন করে লাইসেন্স নিতে বলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ভারত সরকারের ১৯৮৭ সালের আইনে বলা হয়েছে, দেশটির খাদ্যপণ্য মোড়কজাতকরণে দেশে উৎপাদিত পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হবে। দেশটির বিভিন্ন কারখানায় আমদানি করা পাট দিয়ে বস্তা তৈরি করে খাদ্যপণ্য মোড়কজাত করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কমার্শিয়াল) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে জানিয়েছেন ভারতের জুট কমিশনার সুব্রা গুপ্ত।

নতুন করে আমদানিকারকদের লাইসেন্স নেওয়ার আদেশ জারির পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হতে যাওয়া পাটের ট্রাকগুলো বেনাপোল বন্দরে পড়ে থাকলেও ভারত কর্তৃপক্ষ তা ছাড় করেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কমার্শিয়াল) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ভারতের জুট কমিশনার সুব্রা গুপ্তর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর ভারত বন্দরে পৌঁছানো ট্রাকের পাট গ্রহণের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সুব্রা গুপ্ত তাঁকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পাটকলে বিদেশি পাটের বস্তা তৈরির সত্যতা পাওয়ার পর কয়েকটি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকার কঠোরভাবে আইনের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আগে রবিবার বিষয়টি নিয়ে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজেএমসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে জুট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। ঈদের আগে ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তে আমরা চরমভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়েছি। মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছে, বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে তারা। তবে তাতে কাজের কাজ কী হবে, তা নিশ্চিত নয়।' তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের আমদানিকারকদের ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। কারণ তাঁরা অনেকেই টিটির মাধ্যমে অগ্রিম টাকা দিয়ে রপ্তানি আদেশ দিয়েছেন। এখন বাংলাদেশ থেকে পাট নিতে না পারলে তাঁদেরও অনেক লোকসান হবে।

ভারতের জুট কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, আমদানির আগে জুট কার্যালয় বরাবর এনওসি (অনাপত্তিপত্র) চেয়ে আবেদন করতে হবে ভারতীয় আমদানিকারকদের। আবেদনপত্রে পণ্যের মূল বিক্রেতার বিস্তারিত তথ্য থাকতে হবে। আর আমদানিকারক যদি পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহারকারী না হন, তাহলে ওই পণ্যের সর্বশেষ ক্রেতাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নাম আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের কাঁচা পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে রপ্তানি হয়েছে ১০ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের পণ্য, যা মোট রপ্তানির ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কাঁচা পাট নেয় পাকিস্তান ও চীন। এরপরই ভারতের অবস্থান। এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ বরাবরই ঘাটতির মধ্যে থাকে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে ৬৫০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৫০ কোটি ডলারের পণ্য, যার মধ্যে ২২ শতাংশই পাট ও পাটজাত পণ্য।

বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ভারতে হঠাৎ করে পাট রপ্তানি বন্ধের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করা হবে। ইতিমধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ছাড়া আমরা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকেও ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিচ্ছি, যাতে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা