kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

সেক্টর-৪

এক চোখে দেখছি স্বাধীনতা

মো. নাজির আহমদ চৌধুরী, গ্রাম-চারাবই, উপজেলা-বিয়ানীবাজার, জেলা-সিলেট। ২৮ দিনের ট্রেনিং নেন ভারতের লোহারবন্দে। যুদ্ধ করেছেন আটগ্রাম, শাহবাগ, শরতের বাজার এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



 এক চোখে দেখছি স্বাধীনতা

কুশিয়ারা নদীর তীরে বসে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করি আমরা। কিন্তু সীমান্ত পার হতে লাগবে কিছু টাকা-পয়সা। টাকা পাই কোথায়? চাচাতো ভাই আতাউর রহমান পঙ্খিসহ এক রাতে কয়েক মণ ধান চুরি করে বিক্রি করি হাটে। ওই দিনই রওনা হই ভারতের উদ্দেশে।

৯ মে ১৯৭১। সুতারকান্দি বর্ডার পার হয়ে পৌঁছি ভারতের করিমগঞ্জ ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেখান থেকে আসি কলকলি ইয়ুথ ক্যাম্পে। এক দিন পরই সেখানে আসেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল বাকসি। আমার স্বাস্থ্যটা বেশ খারাপ দেখে বাকসি সাহেব বললেন, ‘তুমি যুদ্ধ করতে পারবা না। খেয়ে স্বাস্থ্য বানাও।’ শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ক্যাম্পেই থাকলাম। কয়েক দিন পর দ্বিতীয় ব্যাচে বাছাইয়ের সময়ও ঘটল একই ঘটনা। এবার তিনি বললেন, ‘ইয়ুথ ক্যাম্পের ফিল্ড ইনচার্জ বানিয়ে দিব। তুমি এখানেই থাকো।’ এবার আমি খেপে গিয়ে বলি, ‘বসে বসে খেতে আসিনি। যুদ্ধ করতে এসেছি। তাহলে আমি দেশে গিয়েই মরি।’

তত্কালীন এমপিএ দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেব ছিলেন ওখানে। মনোবল দেখে আমার পক্ষে উনি সুপারিশ করতেই বুকে পড়ল এফএফ নম্বর। ই-৬৯৬৩।

আমাদের ২৮ দিন ট্রেনিং হয় ভারতের লোহারবন্দে। বি কম্পানিতে ছিলাম। টেনিং শেষে অস্ত্র দেওয়া হয় জালালপুর সাব-সেক্টর থেকে। এর কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুর রব সাদী, আর কম্পানি কমান্ডার আশরাফ আলী।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ঘটনা বলছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজির আহমদ চৌধুরী। তাঁর বাবা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সরকারি চাকরি করতেন। আর মা আনোয়ারা চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। বাবার চাকরির সুবাদেই থাকতেন ঢাকায়। ১৯৭১ সালে নাজির আহমেদ ছিলেন নবকুমার ইনস্টিটিউশনের (বর্তমান শহীদুল্লাহ কলেজ) এসএসসি পরীক্ষার্থী।

উনসত্তরের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন নাজির। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন পলাশী এলাকায়। ৭ই মার্চ পলাশী থেকে মিছিল নিয়ে তিনিও যান রেসকোর্স ময়দানে। মঞ্চ থেকে মাত্র দু শ গজ দূরে বসে শোনেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি। তাঁর কাছে ওটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।

২৮ মার্চ ১৯৭১। দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ ভাঙলে পরিবার নিয়ে তারা চলে যান নবাবগঞ্জের জিনজিরায়। সেখান থেকে বহু বাধা পেরিয়ে পৌঁছান সিলেটে। 

এক অপারেশনে পাকিস্তানি সেনাদের একটি গুলি নাজির আহমদের ডান চোখে বিদ্ধ হয়। ফলে নষ্ট হয়ে যায় তাঁর ওই চোখটি।

আবেগাপ্লুত হয়ে সেদিনের কথা বলেন এই মুক্তিযোদ্ধা ‘‘৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। আমরা ছিলাম জালালপুর হেডকোয়ার্টার্সে। পাকিস্তানি সেনাদের একটি ডিফেন্স ছিল জকিগঞ্জের আটগ্রাম ডাকবাংলোতে। অন্যটি সড়কের বাজারে। ডাকবাংলো দখলে নিয়েই আক্রমণ চালাব সড়কের বাজারের ক্যাম্পে—তেমনটাই ছিল পরিকল্পনা।

সুরমা নদীর তীরে ছিল ডাকবাংলোটি। তিনটি গ্রুপে আমরা ছিলাম ৭৬ জন। কমান্ডে আশরাফ ভাই। ভোর ৩টার দিকে আমরা ডাকবাংলোর কাছাকাছি অবস্থান নিই। ২৫ জনের একটি দল সুরমা নদীর ভারত অংশে অবস্থান নেয় কাভারিং ফায়ারের জন্য। দূর থেকে ডাকবাংলো ঘিরে অবস্থান নেয় আরো ২৫ জন। আমরা অবশিষ্ট ২৬ জন অ্যাডভান্স হই। কথা ছিল ৩টা বা ৩টা ৫ মিনিট পর্যন্ত ভারত থেকে ডাকবাংলো লক্ষ্য করে আর্টিলারি ছোড়ার; কিন্তু সব আর্টিলারি এসে পড়ে মাঝামাঝিতে। ফলে পাকিস্তানি সেনারাও তখন অ্যালার্ট হয়ে যায়।

তখন আশরাফ ভাই বললেন, ‘অ্যাডভান্স’। ক্রলিং করে আমরা সামনে এগোই। বৃষ্টির মতো পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়ছিল। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। গড়িয়ে আমরা ধানক্ষেতের আল ধরে এগোচ্ছি। এভাবে ওদের ৫০ গজ ভেতরে ঢুকে পড়ি। ডান পাশে ছিল হায়দার। হঠাৎ তাঁর পেটে গুলি লাগে। নিমেষে রক্তে লাল হয়ে যায় আলের পথটি। বাঁ পাশে তাকিয়ে দেখি মাথায় গুলি লেগেছে আরেক সহযোদ্ধার।

হায়দারকে বাঁচাতে আমি এগোই। তাঁর অস্ত্রটি নিয়ে তাঁকে পেছনে টানতে থাকি। হঠাৎ শো করে একটি গুলি এসে লাগে আমার বাঁ চোখে। আমি ধুপ করে মাটিতে পড়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে পড়ি ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু’।

আমার ডান চোখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছিল। আশরাফ ভাই ছিলেন পেছনে। তাঁর রানেও লেগেছে গুলি। ওই অবস্থায়ই আমাকে তিনি কাঁধে তুলে পেছনে নিয়ে যান। অতঃপর সুরমা নদীতে নৌকায় করে নেওয়া হয় ক্যাম্পে। চোখের যন্ত্রণায় শুধু চিত্কার করছিলাম। পরে আমাকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি গৌহাটি সামরিক হাসপাতালে। সেখান থেকে প্রথমে লখনউ বেইস হাসপাতাল এবং পরে কম্বাইন্ড হাসপাতালে চোখের অপারেশন করে লিড রিপিয়ার করা হয়। গুলিটি আমার ডান চোখের পাতা ভেদ করে নাকের বন ভেঙে দেয়। ফলে এক চোখে আর দেখতে পাই না। দুই চোখে পরাধীনতা দেখেছি, এক চোখে দেখছি স্বাধীনতাকে। এটাই পরম পাওয়া।’’

মন্তব্য